কে থামাবে বেপরোয়া বাসচালককে 

কতটা মর্মান্তিক আর হৃদয়বিদারক হতে পারে একটা ছবি? নাহ, দুই গাড়ির মাঝখানে ঝুলে থাকা রাজীব হোসেনের ধড়বিহীন হাতটা যেন সকল সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে। রাজধানীর গণপরিবহনগুলো দিন দিন ভয়ংকর রকম অনিরাপদ হয়ে উঠছে- ঝুলে থাকা রাজীবের আঙুলগুলো সেদিকেই ইঙ্গিত করে গেল।


ব্যস্ত রাস্তায় রাজধানীর গণপরিবহনগুলো যেভাবে পাল্লা দিয়ে ঘেঁষাঘেঁষি করে চলে তাতে দুর্ঘটনাও যেন বাসগুলোর পেছন পেছন ছুটে। পেছন পেছন যাওয়া সেই দুর্ঘটনার কবলে পড়েন হতভাগ্য রাজীবরা।

সময়টা গত মঙ্গলবার দুপুর সোয়া একটা। ট্রাফিক সিগন্যালের কারণে বাংলামোটর থেকে একটু এগিয়ে সার্ক ফোয়ারার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল বিআরটিসির বাসটি। বাসের ভেতরের ভিড়ের কারণে রাজীব দাঁড়িয়ে ছিলেন বিআরটিসির দোতলা বাসটির পেছনের ফটকে। হাতটি বেরিয়েছিল সামান্য বাইরে।

হঠাৎই পেছন থেকে একটি বাস বিআরটিসির বাসটিকে পেরিয়ে যাওয়ার বা ওভারটেক করার জন্য বাঁ-দিক ঘেঁষে পড়ে। দুই বাসের প্রবল চাপে রাজীবের হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দু-তিনজন পথচারী দ্রুত তাকে পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসকরা চেষ্টা করেও বিচ্ছিন্ন সে হাতটি রাজীবের শরীরে আর জুড়ে দিতে পারেননি।

ততক্ষণে স্বজন পরিবহনের (ঢাকা মেট্রো ব ১১-৯১১৯) বেপরোয়া বাসটির প্রায় অর্ধেকটাই উঠে গেছে ফুটপাতে। রাজীবের গগনবিদারী চিৎকারে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে আশপাশ।

আইন না মানা, বেপরোয়া গতি, যাত্রী নিতে দুই বাসের পাল্লাপাল্লি, যখন-তখন দুর্ঘটনা, দেশজুড়ে এটি এখন হয়ে উঠেছে নিত্যদিনের ঘটনা। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ, অনেকে হয়ে পড়ছে রাজীবের মতো অসহায়।

রাজীব হোসেন (২১) রাজধানীর মহাখালীর সরকারি তিতুমীর কলেজের স্নাতক (বাণিজ্য) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। থাকেন যাত্রাবাড়ীর মীর হাজিরবাগের একটি মেসে। কষ্টেসৃষ্টে পড়াশোনা চালাচ্ছিলেন স্বজনদের সহযোগিতায়।
রাজীবের মা-বাবা অনেক আগেই মারা গেছেন। বাবা হেলালউদ্দীন। তিন ভাইয়ের মধ্যে রাজীব সবার বড়। বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফলের দাসপাড়ায়। রাজীব টিউশনি করতেন এবং চাচা, খালাসহ সবার সহযোগিতায় পড়াশোনা চালিয়ে নিচ্ছিলেন।


পাশের একটি বাসে ছিলেন যাত্রী আলাউদ্দিন হাসান। তিনিই আরও দুজনের সহযোগিতায় বিচ্ছিন্ন হওয়া হাত ছাড়াই রাজীবকে পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে শমরিতা হাসপাতালের একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। শমরিতা হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) চিকিৎসক মো. হোসেন বলেন, রাজীবের জ্ঞান আছে, কিন্তু একটা ঘোরের মধ্যে আছেন। তার সারা শরীরে ব্যথা। বাহুর নিচ থেকে পুরোটাই কাটা পড়েছে। ক্ষতগুলো ঠিক করা হয়েছে। এখন তার অবস্থা স্থিতিশীল। এই আঘাত ছাড়া আর কোনো বড় আঘাত নেই।

দুই বাসের চালক গ্রেপ্তার
দুর্ঘটনার পর মুহূর্তের মধ্যেই দুই বাসেরই চালক ও চালকের সহকারীরা পালিয়ে যায়। পরে বিআরটিসি বাসের চালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার পরদিন অর্থাৎ গতকাল বুধবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে স্বজন বাসের চালককে। বিআরটিসি বাসের চালক ওয়াহিদ এবং স্বজন বাসের চালক খোরশেদ।

চিকিৎসার খরচ বহন করতে হবে দুই বাস মালিককে
রাজীব হোসেনের চিকিৎসা ব্যয় ওই দুই বাস মালিককে বহন করতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গতকাল বুধবার বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ নির্দেশ দেন। রুলে ওই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হাত হারানো রাজীব হোসেনকে কেন এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
এর আগে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল এ ব্যাপারে হাইকোর্টে একটি রিট করেন। রিটের পক্ষে ছিলেন তিনি নিজেই। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অরবিন্দ কুমার রায়।

পরে আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, যাত্রীসাধারণের চলাচল নিরাপদ করতে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে কার্যকর করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনে আইন সংশোধন ও নতুন করে বিধিমালা করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র সচিব, সড়ক পরিবহন ও সেতু সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারসহ আট বিবাদীকে চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে বলে জানান রুহুল কুদ্দুস কাজল।

দিনে দিনে গণপরিবহন আরও বেপোরোয়া হয়ে উঠছে। গণপরিবহনের এই দৌরাত্ম্য নিয়ে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এর প্রতিষ্ঠাতা চিত্রনায়ক কে থামাবে বেপরোয়া বাসচালককে


ইলিয়াস কাঞ্চন খোলা কাগজকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে গত ২৪ বছর ধরে বলে আসছি, সেগুলো সরকার শুনছে না, মালিকরাও শুনছেন না। আমি মনে করি, যে মালিকরা এই ড্রাইভারদের নিয়োগ দিয়েছেন সেই মালিকদের জরিমানা করা উচিত। কারণ তারা এইসব অসভ্য ড্রাইভারদের নিয়োগ দিয়েছেন, এমনকি মালিকরা এইসব ড্রাইভারদের কোনো ট্রেনিংও দেন না।

রাস্তায় গাড়ি নামানো মালিকদের একটা ব্যবসা। তারা যদি কোনো একটা ইন্ডাস্ট্রি দিয়ে এই ব্যবসাটা করত, সেখানে সবচেয়ে অভিজ্ঞ লোকটাকে নিয়োগ দিতে চাইত, তাহলে ড্রাইভার নিয়োগের সময় তারা যার-তার হাতে গাড়ি দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দিচ্ছে কেন?

অনেক মালিক আশা করে বসে থাকেন, সরকার তার ড্রাইভারদের প্রশিক্ষণ দেবে। গাড়ি চালাবে আপনার অথচ প্রশিক্ষণের আশা করবেন সরকারের কাছে, এটা কেন? এই চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

অন্যদিকে বিআরটিসির মাধ্যমে দেড় হাজার বাস কিনে আনা হলো, পাশাপাশি কিন্তু দেড় হাজার ড্রাইভারকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা হয়নি। এক্ষেত্রে সরকার নিজেই তো নিয়মবহির্ভূত কাজ করল। নিয়ম হলো, যতগুলো গাড়ি রাস্তায় নামবে তার ডবল ড্রাইভারকে স্কিলড করে তৈরি রাখতে হবে। এখন সরকারই যদি সেটা না করে তবে সে বেসরকারি মালিকদের এ ব্যাপারে চাপ প্রয়োগ করবে কীভাবে?

মোদ্দাকথা হলো, সরকার এবং বেসরকারি মালিক, কেউই কিন্তু ড্রাইভারদের প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলছে না।’

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.