১৯৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানো শহীদ আমানুল্লাহ মো. আসাদুজ্জামান তার আত্মত্যাগের ৪৯ পর রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হলেন।


একইসঙ্গে এই পদক পেলেন আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে আরেক শহীদ ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউটের সাবেক ছাত্র মতিউর রহমান মল্লিক।

১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককেও সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকে ভূষিত করা হলো।

৪৮তম স্বাধীনতা দিবসের আগে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাদেরকে এই পদক তুলে দেন, তাদের মধ্যে এই তিন জনও ছিলেন। তাদের স্বজনরা এই মরণোত্তর পদক গ্রহণ করেন।

বাংলাদেশে ১৯৭৭ সাল থেকে স্বাধীনতা পদক প্রদান শুরু হয়। চারটি ক্ষেত্রের যেকোনোটিতে কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রাখলে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।

ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে-স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, চিকিৎসাবিদ্যা, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, পল্লী উন্নয়ন, সমাজসেবা বা জনসেবা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, জনপ্রশাসন, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ এবং সরকার নির্ধারিত অন্য যেকোনো ক্ষেত্র।
বিভিন্ন সময় এ পুরস্কার নিয়ে বিতর্কও কম হয়নি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দোসর শর্ষীনার পীর মাওলানা আবু জাফর মোহাম্ম সালেহকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয় ১৯৮০ সালে। শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রাখার কথা বলে এই পদক দেয়া হয় তাকে।

এ ছাড়া ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং কামারুজ্জামানকে হত্যার ঘটনায় নাম আসা মাহবুব আলম চাষীও এই পদক পেয়েছেন বিএনপি সরকারের আমলে।

বিতর্কিতরা পদক পেলেও এতদিন বিবেচিত হননি শহীদ আসাদ, শহীদ মতিউর এবং সার্জেন্ট জরুরুল হক।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে শহীদ আসাদের পক্ষে পদক নেন তার ভাই এফ এম রশিদু্জ্জামান।

শহীদ মতিউর রহমান মল্লিকের পক্ষে পদক নেন এর ভাই মাহমুদুর রহমান মল্লিক।

আর সার্জেন্ট জহুরুল হকের পক্ষে পদক নেন তার ভাতিজি নানজীন হক।

শহীদ আসাদের আত্মত্যাগ

১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের পাশে চাঁনখাঁ'র পুল এলাকায় মিছিল করছিলেন আসাদুজ্জামান। পুলিশ বাঁধা দিলেও তারা বিক্ষোভ চালিয়ে যায়।

এ অবস্থায় কাছ থেকে আসাদকে গুলি করে পুলিশ। আসাদকে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

এরপর আসাদের রক্তমাখা শার্ট নিয়ে হাজারো হাজারো ছাত্র-জনতা মিছিল বের করে এবং শহীদ মিনারের পাদদেশে জমায়েত হয়। ২২, ২৩ ও ২৪ জানুয়ারি সারাদেশে আহ্বান করা হয় ধর্মঘটের। ধর্মঘটের শেষ দিনে পুলিশ আবার গুলি করে। কিন্তু আন্দোলন থামাতে পারেনি।

জনতা ঢাকায় আইয়ুবের নামে থাকা সব স্থাপনা শহীদ আসাদের নামে করে। আইয়ুব এভিনিউয়ের নাম হয় আসান এভিনিউ। আইয়ুব গেটের নাম হয় আসাদ গেট।

আর আসাদের মৃত্যুতে পাকিস্তানের সেনা শাসক আইয়ুব খান দুই মাসের জন্য ১৪৪-ধারা প্রয়োগ স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়।


শহীদ মল্লিকের আত্মত্যাগ

শহীদ আসাদের মৃত্যুর চার দিন পর প্রাণ হারান মতিউর রহমান মল্লিক।

মতিউর তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। শহীদ আসাদকে গুলি করার দৃশ্য কাছ থেকেই দেখেছিলেন মতিউর রহমান।

ঘটনার চারদিন পরে ২৪ জানুয়ারি তার জন্মদিনের দিন ঢাকার রাজপথ মিছিলে মিছিলে আবারও উত্তাল। এদিনের মিছিলেও পুলিশ গুলি করলে নিহত হন মতিউর রহমান মল্লিক।

স্বাধীনতাকামী জহুরুল হক

১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় গ্রেপ্তার হন সার্জেন্ট জহুরুল হক।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায করা হয়েছিল, তাতে আসামি করা হয় এই সেনা কর্মকর্তাকেও।

১৯৬৮ সালের ৬ জানুয়ারি সার্জেন্ট জরুরুল হকসহ ২৮ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তখন সরকারি প্রেসনোটে উল্লেখ করা হয়, ‘গত মাসে (অর্থাৎ ডিসেম্বর, ১৯৬৭) পূর্ব-পাকিস্তানে উদ্ঘাটিত জাতীয় স্বার্থবিরোধী এক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে এদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

বন্দী থাকা অবস্থায় ১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গুলিতে নিহত হন জহুরুল হক।

আর যারা পদক পেলেন

চলতি বছর পদক পেয়েছেন মোট ১৮ জন। এদের মধ্যে উপরোক্ত তিনজনসহ ১০ জনই মরণোত্তর।

স্বাধীনতা ‍ও মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য এই পদক পেয়েছেন সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, শহীদ বুদ্ধিজীবী এম এম এ রাশীদুল হাসান, বঙ্গবন্ধুর সহচর সাবেক সংসদ সদস্য শংকর গোবিন্দ চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক দিনাজপুরের সাবেক সংসদ সদস্য এম আব্দুর রহিম, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি ভূপতি ভূষণ চৌধুরীও (মানিক চৌধুরী)  ও কাজী জাকির হাসান।

মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য জীবিত দুই জনের হাতেও পদক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। এরা হলেন সাবেক বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদ ও সাবেক কূটনীতিক আমজাদুল হক।

এছাড়া চিকিৎসাবিদ্যায় অধ্যাপক ডা. এ কে এমডি আহসান আলী, সমাজসেবায় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান, সাহিত্যে সেলিনা হোসেন এবং খাদ্য নিরাপত্তায় ড. আব্দুল মজিদ, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এবং কৃষি সাংবাদিকতায় চ্যানেল আইয়ের পরিচালক (বার্তা) শাইখ সিরাজকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়।

পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান শেষে পদকপ্রাপ্তরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছবি তোলেন।

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.