বিচারপতিদের অপসারণসংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে জাতীয় সংসদে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জ্যেষ্ঠ সাংসদেরা। তাঁদের কেউ কেউ এ রায় বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ কি না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন।


আজ রোববার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে মাগরিবের নামাজের বিরতির পর অনির্ধারিত আলোচনায় প্রথমে আলোচনার সূত্রপাত করেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) একাংশের সাংসদ মইন উদ্দিন খান বাদল। এরপর সরকারের একাধিক মন্ত্রী-সাংসদ, জাতীয় পার্টির সদস্যসহ মোট ১০ জন সাংসদ এ বিষয়ে বক্তৃতা করেন। তাঁরা সংবিধান প্রণেতাদের দুজন ড. কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের এ বিষয়ে অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করেন। সভা ও সেমিনারে কোনো কোনো বিচারপতির রাজনৈতিক বক্তৃতা করার অভিযোগ তুলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি ওঠে।

সাংসদেরা বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় গণপরিষদের মাধ্যমে ১৯৭২ সালে প্রণয়ন করা সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থী। এই রায়ের ফলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠিত হয়ে যায়নি। তাঁরা মনে করেন, সার্বভৌম সংসদ এ-সংক্রান্ত আইনের সংশোধন করলেই তা কার্যকর হবে। অধিকাংশ সাংসদ তা না করার আহ্বান জানান।

প্রায় আড়াই ঘণ্টা মন্ত্রী, সাংসদ ও জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকদের আলোচনার একপর্যায়ে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, যেহেতু বিষয়টি সংবিধান-সম্পর্কিত, সেহেতু এ বিষয়ে আরও আলোচনার সুযোগ রয়েছে।

প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ তুলে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার দ্বারা গুরুতর অসদাচরণের কথাই আমাকে বলতে হয়। শুধু কয়েক মাস আগে প্রধান বিচারপতি সিনহার আদেশে অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার অবৈধভাবে দুর্নীতি দমন কমিশনে আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত না করার জন্য বলেছেন। হাস্যকর কারণের ওপরে নির্ভর করে তিনি বলেছিলেন, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি দায়িত্ব পালনকালে অনেক কষ্ট করে মৃত্যুদণ্ডসহ অনেক বিচারের ব্যবস্থা করেছেন, রায় দিয়েছেন। তদন্ত যদি তাঁর বিরুদ্ধে করা হয়, সে বিচারের বিষয়ও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এটি করার মাধ্যমে বিচারপতি সিনহা ন্যায়বিচারের প্রতিবন্ধকতা বা বাধা হিসেবে পরিচিত অপরাধ করেছেন, যা দণ্ডবিধির অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তিনি সুপ্রিম কোর্টের নাম শুধু ব্যবহার করেননি, তিনি সুপ্রিম কোর্টের প্যাড ব্যবহার করেছেন। যদিও এটা ছিল তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্ত।’

মতিয়া চৌধুরী আরও বলেন, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল কাছাকাছি পাকিস্তানে আছে। যে পাকিস্তানকে বাংলাদেশ গোরস্থানে পাঠিয়েছে, সে পাকিস্তান হলো প্রধান বিচারপতির আদর্শ। জনগণ কৈফিয়ত নেবেই নেবে। কেউ বিচারের ঊর্ধ্বে না। মতিয়া চৌধুরী ড. কামাল হোসেন ও আমীর-উল ইসলামেরও কঠোর সমালোচনা করেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছেন সেটা নিয়ে আমার বক্তব্য নেই। আমার প্রশ্ন অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে যাঁরা বক্তব্য রেখেছেন, তাঁরা অসত্য কথা বলেছেন। ভুল তথ্য জাতিকে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।’ ড. কামাল ও আমীর-উল ইসলামের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘তাঁরা সুবিধাবাদী। বাহাত্তরে সংবিধান করলেন একরকম, এখন অন্য কথা বলছেন। আইয়ুব খানের পদ্ধতি অ্যামিকাস কিউরিদের পছন্দ। এসব করতে গিয়ে অসত্য কথা বললেন। নীতিহীন ব্যক্তিরা সমাজে ধিক্কৃত হয়। সেটা বলতে চাই না।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম সুপ্রিম কোর্টের রায়কে ‘অবৈধ’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি উচ্চ আদালতকে নিজ দায়িত্বে রায় পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আপনি রায় দিয়েছেন, রায় নিয়ে বসে থাকেন। সংসদ এই রায় কার্যকর না করলে কখনোই তা কার্যকর হবে না। আপনি রায় দিতে থাকেন। সংসদ ও দেশের জনগণ ন্যায্য বিচার করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা নিজেরা রিভিউ করেন যে আমাদের ভুল হয়েছে। আপনারা সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন, আপনাদেরই করতে হবে। আমরা করব না।’

কারও নাম উল্লেখ না করে শেখ সেলিম অভিযোগ করেন, বিচারকেরা মিটিং, মিছিল ও সেমিনারে গিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দেন। এই বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিচারপতিরা রাজনীতি করতে পারেন না। যাঁরা বক্তৃতা দিচ্ছেন, সীমা লঙ্ঘন করে যাচ্ছেন, এই ব্যাপারে চিন্তা করতে হবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী উদার। কিন্তু শত্রুকে শত্রু মনে করতে হবে। মিত্র ভাবা যাবে না। তাঁদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। বিচারপতি, প্রধান বিচারপতি, যেই হোন না কেন, অভিশংসন (ইমপিচ) করতে হবে। রায় দিয়ে ইমপিচমেন্ট ঠেকানো যাবে না।’

ড. কামাল হোসেন ও আমীর-উল ইসলামের সমালোচনা করে শেখ সেলিম বলেন, ‘কোথাকার ডাক্তার তিনি। মুরগি, ছাগল না ভেড়ার। কামাল হোসেন প্রেসক্রিপশন দিয়েছেন, আমীর-উল ইসলাম...। কত বড় মোনাফেক, সুবিধাভোগী। মনে করেছে কনফ্লিক্ট লাগাইয়া যদি সুবিধা নেওয়া যায়? পাকিস্তানের চিন্তাচেতনা আনতে চান? একজনের তো শ্বশুরবাড়ি পাকিস্তানে, মেয়ের জামাই ইহুদি।’

গত সোমবার যখন সুপ্রিম কোর্টে রায় ঘোষণা করা হয়, তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক চলছিল। মন্ত্রীরা সেদিন বলেছিলেন, বাহাত্তরের সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ পুনঃস্থাপন সংবিধানের পরিপন্থী হতে পারে না। সেদিনই আলোচনা হয়েছিল, ৯ জুলাই জাতীয় সংসদ অধিবেশনে এ নিয়ে আলোচনা হবে। মন্ত্রিসভার ওই বৈঠকে অনির্ধারিত আলোচনায় মন্ত্রিসভার সদস্যদের কয়েকজন অসন্তোষ প্রকাশ করে বক্তব্য দেওয়া শুরু করলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে সংসদে আলোচনার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

গত শনিবার গণভবনে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানেও দলের নেতারা সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরোধিতা করে বক্তৃতা করেন।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্র জানায়, গুরুত্বপূর্ণ সাংসদেরা যাতে আজ সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত থাকেন এবং এই বিষয়ে কথা বলার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে আসেন, সেই নির্দেশনা আগেই দেওয়া হয়। অন্য দলের নেতাদেরও আওয়ামী লীগ নেতারা বক্তব্য দিতে উৎসাহিত করেন।

মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন সুপ্রিম কোর্টের রায় পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই রায়ের পেছনে জাতীয় সংসদকে তাঁদের ইচ্ছার অধীনে নিয়ে আসার উদ্দেশ্য রয়েছে। কোনো বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ কি না, তা বিবেচনায় আনতে হবে। তিনি ড. কামাল হোসেন ও আমীর-উল ইসলামের সমালোচনা করে বলেন, কেন তাঁরা আজকে এই অবস্থান নিলেন? তাঁরা সময়-সময় রং বদলান। এবারও রং বদলিয়েছেন। ১/১১-এর সময় কামাল হোসেন সেনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আঁতাত করেছিলেন। তথাকথিত মাইনাস টু ফর্মুলার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।

আওয়ামী লীগের সাংসদ আলী আশরাফ বলেন, দেশটাকে সাংঘর্ষিক অবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই রায় পুনর্বিবেচনা করতে হবে। তিনি বিশিষ্ট দুই আইনজীবীর সমালোচনা করে বলেন, অসাংবিধানিক সরকারব্যবস্থার জন্য পাকিস্তান চ্যাম্পিয়ন। সুশীল সমাজের নামধারীরা, অ্যামিকাস কিউরি নামে কিসের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন, এটা কিসের লক্ষণ?

জাতীয় পার্টির জিয়াউদ্দিন বাবলু বলেন, ড. কামাল হোসেন ও আমীর-উল ইসলাম রং ও ভোল পাল্টেছেন। ১/১১-এর সময় অবৈধ সরকারের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন।

স্বতন্ত্র সাংসদ রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, প্রধান বিচারপতিসহ অন্য বিচারপতিরা সরকারি চাকরিজীবী। প্রধান বিচারপতি ভুল করলে তাঁর বিচার করবে কে? এটা অন্যায় রায়।

জাসদের মইন উদ্দিন খান বাদল বলেন, বিচারকেরা নিজের বিচার করতে পারেন না। এই সংসদই আপনাদের বেতন-ভাতার আইন করেছে।

একাধিক সাংসদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ বিষয়ে ভবিষ্যতেও আলোচনা হতে পারে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ১৪৬ বিধিতে বিষয়টি আলোচনা করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এর মাধ্যমে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.