বাংলাদেশের রেমিটেন্স প্রধান উৎস ৭টি দেশ থেকেই প্রতি মাসেই উদ্বেগজনকভাবে কমছে বৈদেশিক আয়।  এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে বড় চাপ পড়তে পারে এমন শংকা অর্থনীতিবিদদের।  প্রবাসী আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকেই আশংকাজনকভাবে কমছে আয়। এজন্য দায়ী করা হচ্ছে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতাকে।  

প্রধান ৭টি দেশ থেকে উদ্বেগজনকভাবে কমছে বৈদেশিক আয়
খোদ গভর্নরও স্বীকার করেছেন প্রবাসীরা সহজেই দেশে অর্থ পাঠাতে হুন্ডির বিভিন্ন মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। প্রবাসীরাও বলছেন, ডলারের দাম কমে গেছে। যার কারণে হয়রানিমুক্ত ও স্বল্প সময়ে দেশে অর্থ পাঠাতে ব্যাংকবহির্ভূত চ্যানেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন তারা। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে রেমিটেন্সে। তবে দেশ থেকে জনশক্তি রফতানি বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে মধ্যপ্রাচ্যসহ সাত দেশ থেকেই রেমিটেন্স কমেছে ৭১ কোটি ডলার। যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৫ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮০ টাকা করে)। এসব দেশ হচ্ছে- সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন ও সিঙ্গাপুর।

আশংকাজনক হারে রেমিটেন্স কমে যাওয়ায় খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি ব্যাংকের সভাকক্ষে অর্থনৈতিক রিপোর্টারদের এক কর্মশালায় তিনি বলেন, অর্থনীতির বেশিরভাগ সূচক ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও রেমিটেন্স প্রবাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি আরও বলেন, এ বিষয় খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশি রেমিটেন্স প্রেরণকারী দেশগুলো ঘুরে রেমিটেন্স কমার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করে প্রতিবেদন জমা দেবেন। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যসহ সাত দেশ থেকে রেমিটেন্স কমার বিষয়ে গবেষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে (২০১৫-১৬) সাত দেশ থেকে রেমিটেন্স এসেছে ৯৮৩ কোটি ডলার। যা আগের অর্থবছরে (২০১৪-১৫) ছিল ১ হাজার ৫৪ কোটি ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে এসব দেশ থেকে রেমিটেন্স কমেছে ৭১ কোটি ডলার। যা বাংলাদেশী টাকার হিসাবে ৫ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ জানান, খোলা বাজারে (কার্ব মার্কেট) ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় হুন্ডির কাজে জড়িত ব্যক্তিরা উৎসাহিত হয়েছেন। কার্ব মার্কেটের নিয়ন্ত্রণে এখনই বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ছাড়া ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিটেন্স পাঠানোর খরচ অনেক বেশি। কস্ট অব রেমিটেন্স বা রেমিটেন্স পাঠানো ফি মুক্ত রাখা যায় কিনা তা খতিয়ে দেখা উচিত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৭ শতাংশ রেমিটেন্স কমেছে সিঙ্গাপুর থেকে। এ সময় দেশটি থেকে রেমিটেন্স আসে ৩৮ কোটি ৭২ লাখ ডলার। যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪৪ কোটি ৩৪ লাখ ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৭ শতাংশ রেমিটেন্স কমেছে সৌদি আরব থেকে। গত অর্থবছরে রেমিটেন্স আসে ২৯৫ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩৩৪ কোটি ৫২ লাখ ডলার। তৃতীয় সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৬ শতাংশ রেমিটেন্স কমেছে বাহরাইন থেকে।

গত অর্থবছরে রেমিটেন্স আসে ৪৮ কোটি ৯৯ লাখ ডলার। যা আগের অর্থবছরে ছিল ৫৫ কোটি ৪৩ লাখ ডলার। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আয় হয়েছে ২৭১ কোটি ১৭ লাখ ডলার। যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৮২ কোটি ৩৭ লাখ ডলার। কমেছে ৪ শতাংশ। কুয়েত থেকে রেমিটেন্স আসে ১০৩ কোটি ৯৯ লাখ ডলার। আগের বছর ছিল ১০৭ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। এ দেশ থেকে রেমিটেন্স কমেছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। মালয়েশিয়া থেকে রেমিটেন্স আয় হয়েছে ১৩৩ কোটি ৭১ লাখ ডলার। আগের বছর ছিল ১৩৮ কোটি ১৫ লাখ ডলার। কমেছে ৩ দশমিক ২ শতাংশ এবং ওমান থেকে রেমিটেন্স আসে ৯০ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। যা আগের বছর ছিল ৯১ কোটি ৫২ লাখ ডলার। এ হিসাবে রেমিটেন্স কমেছে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর আর্থিক অবস্থা ভালো যাচ্ছে না। বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় মন্দার সৃষ্টি হয়েছে। এতে শ্রমিকদের আয় কমে গেছে। কোথাও কোথাও শ্রমিক ছাঁটাইয়েরও নজির রয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংকিং চ্যানেলের তুলনায় খোলা বাজারে ডলারের দামে ৩ থেকে ৪ টাকার ব্যবধান হওয়ায় হুন্ডির দিকে ঝুঁকছেন গ্রাহকরা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা শনিবার বলেন, অনেক দেশের মুদ্রার দাম কমেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বারবার কমেছে। এ ছাড়া অবৈধভাবে ব্র্যাক ব্যাংকের বিকাশ এবং ডাচ্-বাংলার রকেট ব্যবহার করে অনেক প্রবাসী দেশে টাকা পাঠিয়েছেন। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক দিন ধরে কাজ করছে। কয়েক মাস আগে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে চিঠি পাঠিয়ে সহায়তা চাওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি দেশ সহযোগিতা করেছে। সর্বশেষ বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র সফরে যাবে বলে জানান তিনি।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান ও মেঘনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, ডলারের দাম কমে যাওয়ায় হুন্ডির কারবারিরা সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন। তবে ব্যাংকিং হিসাবে না এলেও এসব টাকা দেশেই প্রবেশ করেছে।

তিনি বলেন, কিছু প্রবাসী ব্যাংকের চেয়ে হুন্ডিতে টাকা পাঠাতে আরাম বোধ করেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হ্রাস পাওয়াও রেমিটেন্স কমায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন তিনি।

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.