‘সূর্য দীঘল বাড়ী’র পর এবার ‘আতিয়া মহল’। সিলেট মহানগরীর উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তে আলোচিত এই বাড়ি দুটির অবস্থান। তবে অবস্থানগত পার্থক্য থাকলেও একটা জায়গায় এ দুই বাড়ীর ‘মিল’ যেন একই সুতোয় গাঁথা। সূর্য দীঘল বাড়ী ও আতিয়া মহল উভয় বাড়িতেই জঙ্গিরা গেড়েছে আস্তানা।

সূর্য দীঘল বাড়ী থেকে আতিয়া মহল
আরেক দিক থেকে এ দুই বাড়ীর অবস্থান সমান্তরালে—সূর্য দীঘল বাড়ীতে আস্তানা গাড়া একসময়কার মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি শায়খ আবদুর রহমান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পাননি; আতিয়া মহলে আস্তানা গাড়া জঙ্গিরাও পারেনি বাঁচতে।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশে একযোগে বোমা হামলা চালিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব ও শক্তির জানান দিয়েছিল জামাআ’তুল মুজাহিদীন (জেএমবি)। এরপর মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গিদের তালিকায় নাম ওঠে নিষিদ্ধ ওই জঙ্গি সংগঠনের প্রধান শায়খ আবদুর রহমানের। আত্মগোপনে থেকে আবদুর রহমান স্ত্রী-সন্তানসহ ঘাঁটি গাড়েন সিলেট মহানগরীর পূর্ব শাপলাবাগের ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ নামক বাড়িতে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শায়খ রহমানের অবস্থান চিহ্নিত করে। ২০০৬ সালের ১ মার্চ মধ্যরাতে সূর্য দীঘল বাড়ি ঘেরাও করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সদস্যরাও আসেন ঘটনাস্থলে। ছয় কক্ষের একতলা সূর্য দীঘল বাড়ির পেছনের দিকে একটি কক্ষে সহযোগী মাজেদুল ইসলাম হৃদয় ও আবদুল আজিজসহ অবস্থান ছিল আবদুর রহমানের। অন্যান্য কক্ষে তার স্ত্রী-সন্তানরা ছিলেন। বাড়ির গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। ভিতরে ছোড়া হয় গ্যাস। পরদিন সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন শায়খ রহমানের স্ত্রী-সন্তানরা। বাড়ির ভিতর বিস্ফোরক রয়েছে বলে নিশ্চিত হন অভিযানকারীরা। তবে বিশেষজ্ঞরা দূর থেকে বিশেষ ধরনের ডিটেক্টর দিয়ে সেগুলো শক্তিশালী বিস্ফোরক নয় বলে নিশ্চিত হন। এরপর শুরু হয় চূড়ান্ত অভিযান। অভিযানকারী বাহিনীর দৃঢ়তায় ভড়কে গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন আবদুর রহমান। তাকে গ্রেফতারের পর সূর্য দীঘল বাড়ি থেকে ছোট আকারের একটি বোমা, দুই কেজি অ্যালুমিনিয়াম, কয়েকটি বই, ব্যবহার্য জিনিসপত্র ও পারিবারিক ছবি উদ্ধার করা হয়। ২০০৭ সালে ঝালকাঠিতে দুই বিচারক হত্যা মামলায় ফাঁসি হয় আবদুর রহমানের।

সেই ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’র কথা এক দশক পর স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে ‘আতিয়া মহল’। সেবার যেমন সূর্য দীঘল বাড়ি ঘিরে দেশজুড়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল, এবারও তা। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ৩টা থেকে সিলেট মহানগরীর দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ী পাঠানপাড়ার পাঁচতলা আতিয়া মহল ঘিরে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আতিয়া মহলের নিচতলায় আস্তানা গেড়েছে জঙ্গিরা এমনটা নিশ্চিত হওয়ার পরই সেটি ঘিরে ফেলা হয়। শুক্রবার থেকে চলছে অভিযান। শনিবার সকালে চূড়ান্ত অভিযান শুরু করেন সেনাবাহিনীর প্যারা-কমান্ডোরা। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে রবিবার জানানো হয়, অভিযানে দুই জঙ্গি নিহত হয়েছে। দুর্ধর্ষ এই কমান্ডো অভিযানে দফায় দফায় বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দে কেঁপেছে পুরো শিববাড়ী এলাকা।

আতিয়া মহলের মালিক উস্তার আলী (৬৫)। সিলেট আমদানি-রপ্তানি অফিসে ক্লার্ক হিসেবে চাকরি শুরু করা উস্তার প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে অবসরে যান। চার ও পাঁচতলা দুটি ভবন মিলে আতিয়া মহল। তার স্ত্রী আতিয়ার নামেই এ ভবন দুটির নামকরণ করেছেন উস্তার। আতিয়া মহলের পাশের একতলা একটি বাড়িতে থাকেন উস্তার আলী। পাশেই তিনতলা আরেকটি ভবন রয়েছে তার। এ ছাড়া নগরীর উপশহরে তিনতলা বাসা ছাড়াও রয়েছে তার কয়েকটি দোকান। পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়ের জনক উস্তার আলী বছর পাঁচেক আগে নির্মাণ করেন আতিয়া মহল। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলাকায় তিনি শালিসি ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। শিক্ষানুরাগী ও দানশীল হিসেবেও সবাই মান্য করে তাকে।

বিএনপি মতাদর্শের হলেও উস্তার আলীর সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের সুসম্পর্ক রয়েছে। সিলেটের গোলাপগঞ্জে বিয়ে করা উস্তার আলীর উত্থানের পেছনে শ্বশুরবাড়ির ভূমিকাও রয়েছে।

হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকায় অবস্থান আতিয়া মহলের। এ ভবনের পেছনে রয়েছে টিলা, যেখানে গ্রিবা মহাপীঠ সর্বানন্দ মন্দির রয়েছে, যা স্থানীয়দের কাছে ‘শিবমন্দির’ নামে পরিচিত। আতিয়া মহলে ভাড়াটে হিসেবে থাকতেন পুলিশ, ফায়ার ব্রিগেডের কর্মকর্তা, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ীসহ নানা পেশার লোকজন। হিন্দু-অধ্যুষিত এবং পুলিশসহ সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে একই ভবনে থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়িয়ে চলা সম্ভব হবে মনে করেই আতিয়া মহলে আস্তানা গাড়ে জঙ্গিরা। এমনটাই ধারণা স্থানীয় মানুষের। আতিয়া মহলের সামনে দুই দিকে রাস্তা রয়েছে। এ ভবন থেকে মাত্র ৫০ গজ দূরেই সিলেট-ফেঞ্চুগঞ্জ আঞ্চলিক সড়ক। রয়েছে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কে যাওয়ার পথও। এ ছাড়া আতিয়া মহলের পেছনে ডোবা থাকায় সেখান দিয়েও পালানো সহজ। এসব কারণে আতিয়া মহলে জঙ্গিরা আবাসস্থল বানিয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সূর্য দীঘল বাড়িতে বিভিন্ন বাহিনীর অভিযানে ৩১ ঘণ্টার মধ্যে তৎকালীন শীর্ষ জঙ্গি শায়খ আবদুর রহমানকে দুই সহযোগীসহ গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু আতিয়া মহলের জঙ্গিবিরোধী অভিযানে পেরিয়েছে প্রায় চার দিন। এটাই এযাবৎকালে বাংলাদেশে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলা জঙ্গিবিরোধী অভিযান। অভিযান পরিচালনাকারী সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সবচেয়ে কঠিন অভিযান ছিল এটা। তবে শেষ পর্যন্ত সফলভাবেই চার জঙ্গিকে হত্যা করা গেছে ‘অপারেশন টোয়াইলাইটে’।

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.