মঙ্গলবার সকাল পৌনে আটটার দিকে রাজধানীর পুরান ঢাকা এলাকার ইত্তেফাক মোড়ের কাছে হেঁটে রাস্তা পার হচ্ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের উপপরিচালক মো. গোলাম হোসেন। উদ্দেশ্য রাস্তার ওপারে গিয়ে মতিঝিলের বাসে উঠে অফিসে যাওয়া। 


তখন সায়েদাবাদ থেকে গাবতলীর দিক থেকে যাত্রীসুদ্ধ একটা বাস এসে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে সড়ক বিভাজকের ওপরে উঠে আটকে গেলে সেটার চালক ও সহযোগীরা তিরের বেগে ছুটে পালান, রাস্তায় পড়ে থাকেন গোলাম হোসেন। পথচারীদের মধ্যে দয়ালু কজন গুরুতর আহত গোলাম হোসেনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

গোলাম হোসেনের বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৮ বছর। মাত্র বলছি এ কারণে যে তাঁর আরও বেঁচে থাকার প্রয়োজন ছিল। কারণ, তিনি তিনটি ছেলেমেয়ের বাবা; সবচেয়ে বড় ছেলেটির বয়স কুড়িও হয়নি, সে সবে রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। পরের ছেলেটির মাধ্যমিক পরীক্ষা চলছে। একমাত্র মেয়েটি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। গোলাম হোসেন ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। আরও কয়েক বছর তাঁর বেঁচে থাকার খুব প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তিনি মারা গেলেন। তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের ওপর বিনা মেঘে বজ্রপাত ঘটল। তাঁদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ল।

প্রতিনিয়ত কত পরিবারের ওপর এমন দুঃখ-বিপর্যয় নেমে আসছে, তার সঠিক হিসাব এই দেশে সত্যিই নেই। সরকারি কর্তৃপক্ষ যে বার্ষিক হিসাব দেয়, তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি বলে অন্যান্য কর্তৃপক্ষ। পুলিশ সূত্রে সরকারি হিসাবে বলা হয়, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে প্রতিবছর আড়াই থেকে তিন হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। যাত্রীকল্যাণ সমিতি নামে একটি বেসরকারি সংস্থা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে তৈরি করা পরিসংখ্যান থেকে বলে সংখ্যাটি সাত-আট হাজার। বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট বলে ১২ থেকে ১৪ হাজার। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলে ২০ থেকে ২২ হাজার।

নথিপত্রের হিসাব বিভ্রান্তিকর হলেও সাধারণ দৃষ্টিতে আমরা প্রতিনিয়তই দেখতে পাচ্ছি, রাস্তাঘাটে এমনভাবে মানুষের মৃত্যু ঘটছে, যা অনিবার্য নয়। দুর্ঘটনার ওপর কারও কোনো হাত নেই—এ ধরনের মানসিকতা আমাদের সমাজে প্রকট। সবচেয়ে বেশি প্রকট সরকারি কর্তৃপক্ষগুলোতে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ, বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশ কর্তৃপক্ষ যেন ধরেই নিয়েছে যে সড়ক দুর্ঘটনা যে মাত্রায় ঘটছে, এ রকম জনবহুল দেশে সেটাই স্বাভাবিক। এই ব্যাপারে তাদের সত্যিকার অর্থে কিছু করার নেই। মুখ রক্ষার খাতিরে তারা যেসব পদক্ষেপ নিয়ে থাকে, সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে যেসব প্রচারণা চালানো হয়, সেগুলো ফলপ্রসূ হচ্ছে না। বরং সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু যেন গা-সওয়া বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। আজকাল একজন-দুজন মানুষের মৃত্যুর ঘটনা সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পাচ্ছে না। গোলাম হোসেনের মৃত্যুর খবরটি সংবাদপত্রে জায়গা পেয়েছে সম্ভবত এই কারণে যে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা।

সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার দায় শুধু সরকারি কর্তৃপক্ষগুলোর নয়। সাধারণ মানুষেরও বিরাট দায় আছে। যাঁরা মারা যাচ্ছেন, তাঁদের অনেকেই দুর্ঘটনায় পড়ছেন নিজের ভুলের কারণে, নিয়ম মেনে না চলার কারণে। গোলাম হোসেনের দৃষ্টান্ত নেওয়া যাক। তিনি বাসের ধাক্কায় মারা গেছেন একটা ব্যস্ত রাস্তা হেঁটে পার হওয়ার সময়। ঢাকা মহানগরে এইভাবে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। জেব্রাক্রসিং, পদচারী-সেতু, আন্ডারপাস—এসব ব্যবহার না করে রাস্তায় চলন্ত যানবাহনের ফাঁকফোকর দিয়ে রাস্তা পার হয় প্রচুর মানুষ। এমনকি অনেক সড়ক বিভাজকের কাঁটাতারের বেড়া ও অন্যান্য প্রতিবন্ধক কেটে, ভেঙে কিংবা ডিঙিয়ে রাস্তা পার হয় অনেক মানুষ। যানবাহনে চাপা পড়ে যারা মারা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে এরাই বেশি।

অবশ্য এমন ঘটনাও ঘটে: আপনি হয়তো রাস্তার কিনার বা ফুটপাতের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন, কিংবা হেঁটে যাচ্ছেন, হঠাৎ কোনো মোটরযান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আপনাকে চাপা দিল। ফুটপাতে হেঁটে চলাচল করার সময় মোটরসাইকেলের ধাক্কায় হতাহত হওয়ার ঘটনাও মাঝেমধ্যেই ঘটছে। রাস্তার উল্টো দিক থেকে কোনো গাড়ি এসে আপনাকে জেব্রাক্রসিংয়ের ওপরেই চাপা দিয়ে চলে যেতে পারে। মোটরসাইকেল যাঁরা চালান, তাঁদের অধিকাংশই ট্রাফিক আইনের ধার ধারেন না। ফুটপাত তাঁদের খুব প্রিয় রাস্তা। মোটরসাইকেল নিয়ে সড়কের উল্টো দিক দিয়ে চলা যায়—এই সুবিধার কথা ভেবেই কেউ কেউ মোটরসাইকেল কিনছেন। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্তাব্যক্তিকে বহনকারী মোটরযানকে সড়কের উল্টো দিক দিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে ট্রাফিক পুলিশ সহযোগিতা করছে—এমন দৃশ্য একটু লক্ষ করলেই দেখতে পাওয়া যায়।

গোলাম হোসেনের মতো করে রাস্তা পার হওয়া যে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ—ঢাকা মহানগরের অধিকাংশ মানুষ এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন নয়। তিনি যে জায়গায় রাস্তাটা হেঁটে পার হচ্ছিলেন, তার আশপাশে কোনো আন্ডারপাস বা পদচারী-সেতু নেই, কিন্তু জেব্রাক্রসিং আছে। কিন্তু হেঁটে যারা রাস্তা পারাপার হয়, তাদের অধিকাংশই জেব্রাক্রসিং ব্যবহার করে না। আবার এ কথাও নিশ্চিত করে বলা যায় না যে জেব্রাক্রসিংয়ের ওপরেই কোনো পদচারীকে কোনো মোটরযান চাপা বা ধাক্কা দেবে না।

আমাদের এই প্রিয় মহানগরের রাস্তাঘাটে চলাচলের সময় কোনো কিছুরই কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। এখানে চলাচল করতে হয় প্রাণটা হাতের তালুতে নিয়ে। 

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.