নজরদারিনর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চাকরিচ্যুত ২৯ শিক্ষক ও কর্মকর্তাকে গোয়েন্দা নজরদারিতে রেখে তাদের বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।



নর্থ সাউথের চাকরিচ্যুত ২৯ জন নজরদারিতে



 গত বছরের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁয় হামলার ঘটনার পর জঙ্গিবাদী কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকার সন্দেহে ক্রমান্বয়ে তাদের বিদায় করা হয়েছিল।

চাকরিচ্যুতদের চারজন এরই মধ্যে দেশ ছেড়েছেন বলে মন্ত্রণালয়ে তথ্য রয়েছে।

ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবকে লেখা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে এ বিষয়গুলো জানানো হয়। দেশের শীর্ষ একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন ওই চিঠির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া ছিল। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন মুখ খুলতে চাননি।

আলোড়ন সৃষ্টিকারী গুলশানের জঙ্গি হামলা ও জিম্মি ঘটনায় ১৮ বিদেশিসহ মোট ২৯ জনের মৃত্যু হয়। জিম্মি উদ্ধারকালে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নিহত পাঁচ হামলাকারী তরুণ এবং দেশের অন্য একাধিক হামলার ঘটনায় জঙ্গিদের মধ্যে কয়েকজন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পাওয়া যায়। ফলে একাডেমিক সুনামের অধিকারী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়টি নেতিবাচক আলোচনায় আসে।

১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রথমদিককার এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২২ হাজার। 

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক, আর্থিক ও শৃঙ্খলা বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তদারকিও বাড়ানো হয়েছে। ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, নর্থ সাউথসহ প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারেই তাদের তদারকি আগের চেয়ে বেড়েছে। জঙ্গিবাদী কিছু ঘটনার সঙ্গে কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততার ঘটনা পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে আসার পর তারা একাডেমিক, প্রশাসনিক, আর্থিক ও শৃঙ্খলা বিষয়ে মনিটরিং জোরদার করেছেন। ইউজিসি নিযুক্ত অডিট ফার্ম দ্বারা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক আর্থিক বিবরণী নিরীক্ষা করা হবে। 

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (এনএসইউ) উপাচার্য অধ্যাপক আতিকুল ইসলাম  বলেন, গত জুলাইয়ের পর সরকার থেকে তাদের কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। প্রতিটিই তারা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের 

অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নানা কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে এবং সন্দেহভাজন কোনো কিছু কারও চোখে ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গেই তা ভালোভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীরা অনির্দিষ্ট সময় ক্যাম্পাসে থাকছেন না। লাইব্রেরি ব্যবহারে যথাযথ নিয়মনীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা শিক্ষার্থীদের বিষয়ে ভালোভাবে খোঁজখবর রাখছেন। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনএসইউ ট্রাস্টি বোর্ডের একজন সদস্য সমকালকে নিশ্চিত করে জানান, 'জঙ্গি কর্মকা ে ও রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত থাকার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বেশ কয়েকজনকে সতর্ক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।' 

কড়া নজরদারি :গুলশান হামলার পটভূমিতে এনএসইউর প্রায় দুই ডজন শিক্ষক গত ছয় মাসে চাকরি হারিয়েছেন। কারণ, পুলিশ ও ইউজিসির পৃথক তদন্তে তারা সন্দেহের আওতায় আসেন। গত বছরের শুরুতে প্রথম চাকরিচ্যুত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব লাইফ সায়েন্স অনুষদের ডিন ও ভারপ্রাপ্ত প্রোভিসি গিয়াস উদ্দিন আহসান (জিইউ আহসান)। হামলাকারীদের নিজ বাসায় আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে তিনি গ্রেফতার হয়ে রিমান্ডে থাকা অবস্থায় প্রথমে সাময়িকভাবে ও পরে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত হন। 

এরপর একই অভিযোগে চাকরি হারান ভারপ্রাপ্ত লাইব্রেরিয়ান মোস্তাফিজুর রহমান। চাকরিচ্যুত অন্যদের মধ্যে আছেন বাণিজ্য অনুষদের ডিন অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান, অধ্যাপক হান্নান মিয়া, ড. জসিমউদ্দিন আহমেদ, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবদুল আউয়াল, ওই বিভাগের শিক্ষক ড. আতাউর রহমান ও ড. আবুল এল হক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা গোলাম জলিল, রেজিস্ট্রার শাহজাহান এবং আরও একজন ডেপুটি রেজিস্ট্রার। এদের মধ্যে ড. আবদুল আউয়াল শিক্ষার্থীদের মগজধোলাইয়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন বলে সন্দেহ করা হয়। 

শিক্ষকদের বাইরে সন্দেহের তালিকায় রেজিস্ট্রার অফিসের একজনসহ দু'জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও ট্রাস্টি বোর্ডের দুই সদস্য আছেন বলে জানা যায়। ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য শাহ আবদুল হান্নান জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। 

খণ্ডকালীন শিক্ষক ও ভিজিটিং প্রফেসরদের মধ্যে কেউ কেউ বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ নেন বলে সন্দেহভাজন আছেন।

হামলার সময় হলি আর্টিসানে সপরিবারে উপস্থিত থেকে জিম্মি অবস্থা থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম নর্থ সাউথের সাবেক শিক্ষক আবুল হাসনাত রেজা করিমকে সন্দেহ করে এখনও আটক রাখা হয়েছে। 

বরখাস্ত হওয়ার পর কয়েকজন আবার চাকরি ফিরে পেয়েছেন বলেও জানা গেছে। 

উপাচার্য অধ্যাপক আতিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, 'জঙ্গিবাদ দমনে আমরা খুবই কঠোর। যেসব শিক্ষক সম্পর্কে অভিযোগ আছে, তাদের ব্যাপারেই আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। ইউজিসি আমাদের কাছে যেসব তথ্য চেয়েছে, তার সবই আমরা দেব। এ মুহূর্তে আমরা এ বিষয়ে আর কিছু বলতে চাইছি না। আগে থেকেই আর কারও নামও বলতে চাইছি না। তবে জড়িত থাকলে কেউ ছাড় পাবে না।'

চাকরিচ্যুত বিজনেস অনুষদের ডিন ড. মাহবুব রহমান স্থায়ী শিক্ষক ছিলেন। ড. এ এফ এম আতাউর রহমান বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএস করে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করেছেন। আবুল এল হক কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন ওন্টারিও থেকে এমএসসি ও যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওকলাহোমা থেকে পিএইডি করেছেন। মো. হান্নান মিয়া যুক্তরাষ্ট্রের উইচিটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ, এমএ ও এমবিএ করেছেন। ড. জসিমউদ্দিন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব নর্থ হুমবরিয়া থেকে মার্কেটিং ও ম্যানেজমেন্টে এম করেন। এরপর ইউনিভার্সিটি অব লিংকন থেকে পোস্টগ্র্যাজুয়েট ও ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টার থেকে পিএইচডি করেন।

কমিটি বাতিলের নির্দেশ :এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯টি কমিটি ভেঙে দিতে নির্দেশ দেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছে ইউজিসি। দুই সপ্তাহ আগে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়েছে, 'বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এর ধারা ১৪(১)-এ বর্ণিত কমিটি/কর্তৃপক্ষের বাইরে ধারা ১৪(২) অনুযায়ী গঠিত নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ১৯টি কমিটি/কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বাতিল করতে হবে।'

ইউজিসির চিঠিতে জানানো হয়, রাষ্ট্রপতি তথা চ্যান্সেলরের অনুমোদন নিয়েই গত কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টি তাদের অভ্যন্তরীণভাবে এই ১৯টি কমিটি গঠন করে। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে এই ১৯টি কমিটি বাতিল করতে হবে। 

ওই কমিটিগুলো হলো বিভাগীয় প্রধানদের নেতৃত্বাধীন প্রোগ্রাম রিভিউ কমিটি, ট্রাস্টি বোর্ড চেয়ারম্যান এম এ কাশেমের নেতৃত্বে গঠিত প্রশাসনিক পদোন্নতি কমিটি, উপাচার্যের নেতৃত্বে শিক্ষক পদোন্নতি কমিটি, উপ-উপাচার্যের নেতৃত্বে লাইব্রেরি কমিটি, উপাচার্যের নেতৃত্বে শিক্ষক অনুসন্ধান কমিটি, ডিগ্রি পর্যালোচনা কমিটি. ছাত্র ভর্তি কমিটি, কোষাধ্যক্ষের নেতৃত্বে নিড এসেসমেন্ট কমিটি ও টেকনিক্যাল কমিটি, ট্রাস্টি বোর্ড সদস্য এম এ হাশেমের নেতৃত্বে ক্রয় কমিটি, উপ-উপাচার্যের নেতৃত্বে শিক্ষক ছুটি কমিটি, একাডেমিক রিভিউ কমিটি, ট্রাভেল ও রিসার্চ গ্র্যান্ট কমিটি, এম এ হাশেমের নেতৃত্বে আইন ও সাংবিধানিক কমিটি ও ছাত্রবৃত্তি কমিটি, অপর ট্রাস্টি বোর্ড সদস্য মো. শাহজাহানের নেতৃত্বে ক্যাম্পাস উন্নয়ন কমিটি, ট্রাস্টি বোর্ড সদস্য মো. বেনজির আহমেদের নেতৃত্বে অডিট কমিটি, ইন্টারন্যাশনাল প্রমোশন অ্যান্ড এফিলিয়েশন কমিটি ও কোষাধ্যক্ষের নেতৃত্বাধীন টেকনিক্যাল কমিটি। 

উপাচার্য অধ্যাপক ড. আতিকুল ইসলাম বলেন, 'এসব কমিটি গঠনের অনুমোদন মন্ত্রণালয়ই দিয়েছিল, এখন আবার তারাই কমিটিগুলোর অনুমোদন বাতিল করতে বলেছে। এটা কেন হচ্ছে, তা আমি বলতে পারব না।'

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.