মাথার ওপরে ঝকঝকে নীল আকাশ। দৃষ্টিসীমা বাধা পড়ে গাঢ় সবুজ পাহাড়ে। কোনোটার মাথায় আবার চকচক করছে তুষারের টুপি।







 দৃষ্টিজুড়ে মুগ্ধতার এমন আবেশের ছেদ পড়ল পাইলটের কণ্ঠ শুনে_ কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা নামছি ভুটানের মাটিতে। তবে নামার ব্যাপারটা বেশ ঝক্কির। রীতিমতো পাহাড়ের ফাঁক গলিয়ে বিশেষ কৌশলে বিমানের চাকা রানওয়ে ছুঁল। ততক্ষণে যাত্রীদের অবস্থা দফারফা। বিশ্বের যে ক'টি বিমানবন্দরে বিমান ল্যান্ড করতে পাইলটদের গলদঘর্ম হতে হয়, পারো তার মধ্যে অন্যতম। বিশেষ প্রশিক্ষণের পরই এখানে বিমান চালানোর অনুমতি মেলে 

ভুটানকে কেন এশিয়ার সুইজারল্যান্ড বলা হয়, বিমান থেকে নামামাত্রই তা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। ২৫-২৬ ডিগ্রি থেকে সোজা ২-৩ ডিগ্রিতে! লেখনীতে এ অনুভূতি বোঝানো দুষ্কর। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ট্যাক্সি নিয়ে সোজা থিম্পুর পথে। থিম্পু ভুটানের রাজধানী হলেও শহরটিতে নেই কোনো বিমানবন্দর। দেশটির একমাত্র বিমানবন্দর পারো। প্রকৃতি দেবীর আপন খেয়ালে গড়া দেশটি যে আগামী ক'দিন মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখবে, তা এরই মধ্যে টের পেতে শুরু করেছি। সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলা পাহাড় কেটে তৈরি রাস্তাটি আমাদের পেঁৗছে দিল থিম্পুতে। এরই মধ্যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। শহরের কেন্দ্রেই ক্লকটাওয়ারের সামনে হোটেল তাসিতে থাকার ব্যবস্থা হলো। 

ছবির মতো গোছানো ছোট্ট শহর থিম্পু। বাড়িঘর প্রায় সবই নিজস্ব বিশেষ রীতিতে করা। পরে জেনেছিলাম, নিয়ম করেই ভুটানে এমনটি মানা হয়। যাই হোক, চাল দিয়ে তৈরি বিশেষ ধরনের স্যুপ আর চাওমিন দিয়ে হলো প্রথম রাতের উদরপূর্তি। 

পরদিন ভোরবেলা বের হলাম চোয়েতেন নামের মনেস্ট্রি বা বৌদ্ধ উপাসনালয় দেখতে। হোটেল থেকে বেরুতেই তীব্র শীতে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাল পথের ধারে হাজারো কবুতর। মনেস্ট্রিতে তখন সকালের প্রার্থনা করতে আসা ভক্তদের ভিড়। এরপর গন্তব্য দেশটির সচিবালয় ভবন। কোনো দেশের সচিবালয় যে একটি দেখার মতো জায়গা হতে পারে, তা এখানে না এলে জানাই হতো না। মাঝারি আকৃতির ঘরের মতো কিছু দূর পরপর একটা করে ঘর। এগুলো একেকটি একেক মন্ত্রণালয়! সচিবালয়ের পাশেই থিম্পুর সবচেয়ে সুন্দর মনেস্ট্রি তাশিচো জং। ভেতরে বিরাট বুদ্ধমূর্তি। মনে হয় কালের গতি যেন এখানে বাঁধা পড়েছে নিজ গরজে। এখান থেকে বেরিয়ে ঘুরে বেড়ালাম শহরের বিভিন্ন সড়কে। গোটা শহরই যেন কেউ পরম মমতায় সাজিয়ে রেখেছে। ভুটানের মানুষ এশিয়ার সবচেয়ে শান্তিপ্রিয়। অপরাধের হার প্রায় শূন্য। যতই দেখি, লাল-সবুজের বাংলাদেশের কথা ভেবে বুকের ভেতর হাহাকার জাগে।

পরদিনের গন্তব্য আবার পারো। এবার আর ট্যাক্সি নয়, বাসে চেপে রওনা হলাম সকাল সকাল। পারোতে হোটেলে হাজিরা দিয়েই বেরিয়ে পড়লাম ট্যাক্সি নিয়ে। একে একে দেখা হলো শহরের ভেতর বেশ কিছু ধর্মীয় ও প্রাচীন স্থাপনা। পারোর সবচেয়ে জনপ্রিয় জায়গা পারো টাক্টসাং, যা টাইগার্স নেস্ট নামে বেশি পরিচিত। এটি মূলত একটি মনেস্ট্রি, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩১২০ মিটার উচ্চতায় তৈরি। বেসক্যাম্প পর্যন্ত গাড়িতে যাওয়া যায়, এরপর হাঁটা। কেউ চাইলে ঘোড়াতেও সওয়ার হতে পারে। দেশে টুকটাক পাহাড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছিল, এ আর এমন কী! তবে উঠতে গিয়ে বুঝলাম কত ধানে কত চাল! একটা বিষয় যতই ভাবছিলাম, ততই অবাক হচ্ছিলাম, এত ওপরে পাহাড়ের খাঁজে এমন স্থাপনা বানানো কীভাবে সম্ভব! টাইগার্স নেস্টে ভুটানের স্থানীয় মানুষের আধিক্য যেমন ছিল তেমনি ছিল প্রচুর বিদেশি পর্যটক। মিথ আছে, জীবনে অন্তত একবার এই মনেস্ট্রিতে এলে মনের ইচ্ছা পূরণ হয়।

এ ক'দিনের ভুটান ভ্রমণে মনে আক্ষেপ ছিল ডিসেম্বর মাস সত্ত্বেও তুষার না দেখার। সে আক্ষেপ ঘুচে যায় চেলালা গিয়ে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩৯৮৮ মিটার উঁচুতে চেলালার অবস্থান। নামটি অনেক ট্যুরিস্টের কাছেই অপরিচিত। এক ভারতীয়ের কাছে শুনে চেলালায় গিয়ে মনে হয়েছে, এখানে না এলে সফরটি নিশ্চিতভাবেই অপূর্ণ থেকে যেত। 

চারদিনের সফর শেষে ঘরে ফেরার পালা। তবে ফেরার সময় প্রতিজ্ঞা করে এসেছি, আবার যাব, শিগগিরই...

কীভাবে যাবেন

ঝামেলাবিহীনভাবে ভুটানে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় আকাশপথ। ঢাকা থেকে ডরুক এয়ার নিয়মিতভাবে যাতায়াত করে। যাওয়া-আসা ১৯ হাজার থেকে ২২ হাজার টাকার মধ্যে। এ ছাড়া সড়কপথে ভুটানে যাওয়া যায়। ভারতের শিলিগুড়ি হয়ে, ভুটানের ফুন্টশিলিং হয়ে থিম্পু। সে ক্ষেত্রে ভারতের ট্রানজিট ভিসা লাগবে। কমলাপুর থেকে সরাসরি শিলিগুড়ির বাস পাওয়া যায়। শিলিগুড়ি থেকে বাসে করে সোজা ফুন্টশিলিং। সময় লাগবে ঘণ্টা দুয়েক। বর্ডার পার হয়ে বাস অথবা ভাড়া গাড়িতে যেতে হবে থিম্পু। 

থিম্পু, পারো ছাড়াও পুনাখা ঘুরে দেখতে পারেন ভুটানে। এর বাইরে অন্যান্য শহরে যেতে হলে অনুমতি প্রয়োজন। ভুটানের গুলট্রাম আর ভারতের রুপির মান সমান। সব জায়গাতেই ভারতের রুপি চলে। 

ভুটানের প্রায় সব জায়গায় ট্যাক্সি চলে। পাবলিক বাস খুব কম। সময় আর এনার্জি থাকলে হেঁটেই ঘুরে দেখা যায় অনেকটা। প্রতি বেলা ভাত খাওয়ার আশা করলে আপনাকে পস্তাতে হবে। নুডলস বা চাওমিন জাতীয় খাবার ভুটানে বেশি চলে। তবে কিছু হোটেলে ভাত-তরকারি পাওয়া যায়। যদিও স্বাদ নিয়ে কতটা সন্তুষ্ট হবেন সান্দেহ আছে। 

দরদাম করে নিলে এক হাজার রুপির মধ্যে পরিচ্ছন্ন থাকার হোটেল পাওয়া যাবে। এর বাইরে তারকা মানের হোটেলও পর্যাপ্ত আছে।

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.