আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো দেশের অত্যন্ত স্পর্শকাতর স্থানে হামলার ছক কষেছিল নব্য জেএমবি। এ ছাড়া নাশকতার পরিকল্পনা ছিল বড়দিন ও থার্টিফার্স্ট নাইট ঘিরেও।



রাজধানীর আশকোনায় অপারেশন রিপল-২৪ নামের বিশেষ অভিযানের পর আত্মসমর্পণকারী নারী জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য ও সংগৃহীত আলামতের সূত্রে জানা গেছে এ পরিকল্পনার কথা।


জানা গেছে, হলি আর্টিসানে হামলার পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একের পর এক অভিযানে ভেঙে পড়ে নব্য জেএমবির সাংগঠনিক কাঠামো। সংগঠনের সমন্বয়ক তামিম চৌধুরী, মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম নিহত হওয়ার পর মাইনুল ইসলাম ওরফে আবু মুসার হাত ধরে সংগঠনটি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে।


আশকোনার ৫০ সূর্য ভিলার বাড়িটির নিচতলায় সেই আয়োজনই চালাচ্ছিল মুসা। গোপনে নব্য জেএমবিকে নতুনভাবে সংগঠিত করে তোলার বিষয়ে মুসার নানা তৎপরতার তথ্য পাওয়া গেছে তারই স্ত্রী তৃষ্ণা মনি ওরফে তৃষার কাছ থেকে।


পুলিশের কাছে তৃষা 'সিস্টার্স ডিপার্টমেন্ট' নামে নারী জঙ্গিদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ শাখা গড়ে তোলার তথ্য দিয়েছে। এ শাখায় নারী জঙ্গিরা সক্রিয়ভাবে সংগঠনের জন্য কাজ করে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।


আশকোনার জঙ্গি আস্তানায় অভিযানকালে আত্মসমর্পণকারী দুই নারী জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলা (৩৪) ও মুসার স্ত্রী তৃষা মনি ওরফে উম্মে আয়শাকে (২২) জিজ্ঞাসাবাদে গতকাল সাত দিনের হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। সোমবার তাদের ঢাকার আদালতে তুলে ১০ দিনের রিমান্ড চান কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক সায়েদুর রহমান। শুনানি শেষে মহানগর হাকিম মেহের নিগার সূচনা সাত দিন হেফাজতের নির্দেশ দেন। আদালতে তাদের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিল না। আদালতে হাজির করার সময় শিলার কন্যা মারিয়াম বিনতে জাহিদ (এক বছর চার মাস) ও তৃষ্ণা মনির মেয়ে জুয়াইদিয়া ওরফে ফাতিহা (চার মাস) তাদের সঙ্গে ছিল।


এদিকে, নিহত নারী জঙ্গি সাকিনার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে, তার জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার জন্য আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়েছে।


'সিস্টার্স ডিপার্টমেন্ট': তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, নব্য জেএমবির আদর্শে কোনো না কোনোভাবে বিশ্বাসী এমন নারীদের একটি বিভাগ রয়েছে। তাদের নাম দেওয়া হয়েছে 'সিস্টার্স ডিপার্টমেন্ট'। এ বিভাগে দুই ধরনের সদস্য রয়েছে। এক- মুজাহির, যারা এরই মধ্যে হিজরত করে পরিবারের সদস্যসহ জেএমবিতে যুক্ত হয়ে গেছে। এ শাখার সদস্যদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে সাংগঠনিক বিধিনিষেধ রয়েছে। তাদের দেখভালের দায়িত্ব সংগঠনের নেতৃস্থানীয়দের। জেএমবির এ শাখার ৩০ জন সদস্য এখনও অধরা। সিস্টার্স ডিপার্টমেন্টের আরেকটি শাখা হলো- মুনাদির। এই শাখায় যারা রয়েছে, তারা সাধারণত নিজ নিজ বাসায় অবস্থান করে উগ্রবাদী তৎপরতায় যুক্ত। এই শাখার শতাধিক সদস্য রয়েছে। গোয়েন্দারা বলছেন, অনুকূল পরিবেশ পেলে মুনাদির শাখার সদস্যরা হিজরত করতে প্রস্তুত থাকে। জেএমবি নারী শাখার সদস্যদের কেউ কেউ বিভিন্ন অপারেশন চালাতে পারদর্শী। তবে এই শাখার অধিকাংশ সদস্য এখনও উগ্রপন্থায় বিশ্বাসী। নব্য জেএমবির সদস্য সাগর, সেলিমসহ কয়েকজনের স্ত্রীকে খুঁজছেন গোয়েন্দারা।


নতুন হামলার ছক: দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, মুসা জেএমবির কয়েকজন সদস্যকে ব্যবহার করে হামলার ছক করেছিল। দেশের একটি বিমানবন্দরে হামলার পরিকল্পনা করছিল সে। হজে যাওয়ার নামে বিমানবন্দরে ঢুকে হামলার একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা তার ছিল বলে গোয়েন্দারা জানতে পারেন। চলতি বছরের আগস্টে ওই হামলার ছক কষে সে। তবে পরিবেশ অনুকূলে না থাকায় সেই পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে এসে নতুনভাবে ছক সাজায়। আশকোনার ৫০ সূর্য ভিলা বাড়ি থেকে উদ্ধার আলামত দেখে গোয়েন্দারা বলছেন, সেখানে তারা অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুদ গড়ে তোলে। ওই ফ্ল্যাটের অধিকাংশ বাসিন্দা নারী হওয়ায় মুসা বাসাটি 'সেফ হোম' মনে করত।


যে কারণে স্বামীর ওপর ক্ষুব্ধ ছিল তৃষ্ণা: সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, মুসা সম্প্রতি আরও একাধিক জঙ্গির স্ত্রীকে বিয়ে করার কথা তার স্ত্রীকে জানায়। স্বামীর এই ইচ্ছার বিষয়টি ভালোভাবে মেনে নিতে পারেনি তৃষ্ণা। মুসা সম্প্রতি ওই বাসায় অবস্থানরত জাহিদুলের স্ত্রী শিলাকে বিয়ে করার প্রস্তাবও দেয়। এটি জানার পর থেকে স্বামীর সঙ্গে তৃষ্ণার দূরত্ব বাড়তে থাকে। এরই মধ্যে তৃষ্ণা গোয়েন্দাদের জানায়, মুসার কারণে সে উগ্রপন্থায় আসতে বাধ্য হয়।


অনড় শিলা: সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, স্ত্রী শিলা এখনও বিশ্বাস করছে, তার স্বামী ও সে সঠিক পথে রয়েছে। সে তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত নয়।


এদিকে, শিলার সঙ্গে মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে দেখা করানো হয়েছে তার আরেক শিশুসন্তানকে। ১০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আজিমপুরে অভিযানের পর শিলার ওই সন্তানকে সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়। এখন সে স্বজনদের কাছে রয়েছে। গোয়েন্দাদের কাছে শিলার ওই শিশুকন্যা জানায়, তার মা-বাবা ভুল পথে পা বাড়িয়েছে। একজন কর্মকর্তা জানান, আত্মসমর্পণকারী দুই নারীর সঙ্গে দুই শিশু রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় এসব বিষয় মাথায় রাখা হচ্ছে।


তিন আসামি এখনও অধরা: আশকোনার ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারভুক্ত তিন আসামি এখনও অধরা। এর বাইরে আরও তিন-চারজন অজ্ঞাত আসামি রয়েছে। তারা হলো- মাইনুল ইসলাম ওরফে আবু মুসা (২৯), সেলিম (২৬) ও ফিরোজ (২০)। এ মামলায় আরও আসামি করা হয়েছে, মুসার স্ত্রী তৃষ্ণা ওরফে তৃষা মনি ওরফে উম্মে আয়েশা (২২), তাদের বাড়ি রাজশাহীর বাগমারায়, নিহত অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলা ওরফে সুমাইয়া ওরফে মারজুন (৩৪)। তার বাড়ি কুমিল্লার মধ্য ধনাইতরী গ্রামে। মৃত সাকিনা ওরফে শাকিরা ওরফে তাহিরা (৩৫), মৃত আফিফ কাদেরী ওরফে আদরকে (১৪) এ মামলায় আসামি করা হয়।

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.