তাজরীন ফ্যাশনসে ২০১২ সালে দেশের সবচেয়ে প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছিলেন ১১১ জন। তারপর আরও বেশ কয়েকটি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে বিভিন্ন কারখানায়। সর্বশেষ গত মঙ্গলবারও আশুলিয়ায় কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে এক শিশু শ্রমিকের ​মৃত্যু হয়, দগ্ধ হয় ২৬ জন।



এখন পর্যন্ত কোনো দুর্ঘটনার দায় কাউকে নিতে হয়নি। সাজা হওয়ার কোনো দৃষ্টান্তও নেই
আশুলিয়ার জিরাব এলাকার গ্যাস লাইটার কারখানার আগুনে দগ্ধ মুক্তি এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। পাশে স্বজনের অসহায় অপেক্ষা l 

ঢাকার আশুলিয়ায় কালার ম্যাচ বিডি লিমিটেড নামের গ্যাস লাইটার প্রস্তুতকারী কারখানাটি ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আগুন নেভানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। লাইটার তৈরির মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের নিরাপত্তা জ্যাকেট দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা মানা হয়নি। সেখানে কর্মরত শ্রমিক ও স্থানীয় থানার পুলিশের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। গত মঙ্গলবার এই কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হন ২৬ জন নারী ও শিশু। তাঁদের মধ্যে আঁখি (১৪) নামের এক শিশু মারা গেছে।

ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ডিইপিজেড) স্টেশনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আবদুল হামিদ বলেন, কারখানাটিতে হাতে বহনযোগ্য কয়েকটি অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র পাওয়া গেছে। এসব যন্ত্রের সাহায্যে ছোটখাটো আগুন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। কিন্তু বড় ধরনের আগুন নেভানোর মতো কোনো সরঞ্জাম কারখানাটিতে ছিল না।

এ ঘটনায় মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, কারখানাটির মালিক তিনজন—মাসুদ কাউসার, মাহমুদ আলম ও শামীম এলাহী। তাঁদের একজন সরকারদলীয় এক সাংসদের আত্মীয় বলে জানা গেছে। পুলিশ বলেছে, তাঁরা তিনজনই গা ঢাকা দিয়েছেন।

জিরাব এলাকায় প্রায় এক বিঘা জমির ওপর কারখানাটি। লাইটারের যন্ত্রাংশ আমদানি করে এখানে নতুন গ্যাস লাইটার তৈরির পাশাপাশি পুরোনো লাইটার পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হতো। এখানে প্রায় আড়াই শ শ্রমিক কাজ করতেন। যে কক্ষটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়, সেখানে কাজ করবেন প্রায় ৪০ জন নারী ও শিশু শ্রমিক। পুরোনো লাইটার থেকে গ্যাস বের করা ছিল তাদের কাজ। ফলে ওই ঘরে সব সময়ই গ্যাস থাকত। সামান্য স্ফুলিঙ্গ থেকেই অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কা ছিল সব সময়।



ঢাকার আশুলিয়ার জিরাব এলাকায় গত মঙ্গলবার অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যায় কালার ম্যাচ বিডি লিমিটেড। আগুনে দগ্ধ শ্রমিকদের মধ্যে ৯ শিশু শ্রমিকসহ ২১ জনকে মঙ্গলবার রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট এবং পাঁচজনকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এনাম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শ্রমিক রহিমা বলেন, মাস দেড়েক আগে তিনি এই কারখানায় চাকরি নেন। প্রতিদিন একটি কক্ষে তাঁরা ৩০-৪০ জন নারী ও শিশু শ্রমিক গ্যাস বের করার কাজ করতেন। কাজ করার সময় তাঁদের কেউ একজন একটি লাইটারে আগুন ধরালে মুহূর্তের মধ্যে পুরো কক্ষ আগুনে ছেয়ে যায়।

একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরেক নারী শ্রমিক বলেন, তাঁরা প্রতিদিন কয়েক হাজার পুরোনো গ্যাস লাইটার থেকে গ্যাস বের করতেন। কিন্তু তাঁদের নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। আগুন প্রতিরোধী কোনো পোশাকও দেওয়া হয়নি। শুধু ওই কক্ষে আগুন জ্বালানো যাবে না বলে সতর্ক করা হয়েছিল।

ঢাকা জেলা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, কারখানার শ্রমিকদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। প্রচলিত আইন অনুযায়ী, শিশুদের এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত করা দণ্ডনীয় অপরাধ। তা ছাড়া এ ধরনের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের নিরাপত্তা জ্যাকেট থাকার কথা। কিন্তু কালার ম্যাচ বিডি লিমিটেডের শ্রমিকদের কোনো নিরাপত্তা জ্যাকেট সরবরাহ করা হয়নি।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ। কমিটির প্রধান ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) দিলীপ কুমার ঘোষ বলেন, কারখানার মালিক ও কর্মকর্তারা গা ঢাকা দেওয়ায় তদন্তকাজ ব্যাহত হচ্ছে।

কারখানাটিতে গ্যাস লাইটার প্রস্তুত করার উপযুক্ত পরিবেশ ছিল কি না জানতে চাইলে দিলীপ কুমার ঘোষ বলেন, তদন্ত শেষ না করে তা বলা মুশকিল। ফায়ার সনদ থাকলেও বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছিল কি না, সেটাও তদন্ত করা হচ্ছে। মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহসিনুল কাদির বলেন, অগ্নিকাণ্ড ও হতাহতের ঘটনায় কোনো অভিযোগ আসেনি। কাউকে আটকও করা হয়নি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের একাধিক চিকিৎসক জানিয়েছেন, আঁখি নামের এক শিশু শ্রমিক মঙ্গলবার রাত পৌনে তিনটার দিকে মারা যায়। শ্বাসনালিসহ এই শিশু শ্রমিকের শরীরের ৩৫ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। তাকে রাখা হয়েছিল নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ)। সে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বেগমপুর গ্রামের আশরাফুল আলমের মেয়ে।

মিঠাপুকুরের আরেকজন নারী শ্রমিক জান্নাতি (২০) বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন আছেন। তাঁর বাবা রিকশাচালক বাবুল মিয়াকে গতকাল বার্ন ইউনিটের বারান্দায় বিলাপ করতে দেখা যায়। তিনি বলেন, এক বছর আগে জান্নাতির বিয়ে হয়। স্বামী ভ্যানচালক। অভাবের কারণে কয়েক মাস আগে জান্নাতি জিরাব এসে ওই কারখানায় যোগ দেন। আগুনে তাঁর মুখ, হাত, পা ও কোমরের কিছু অংশ পুড়ে গেছে। বাবুল মিয়া বলেন, মেয়ে তাঁকে দেখে শুধু কাঁদছেন।

হাসপাতালে ভর্তি অন্যদের সম্পর্কে জানা গেছে, এসব শ্রমিকের প্রায় সবাই দরিদ্র। ভিটেমাটি পর্যন্ত নেই। পেটের দায়ে দৈনিক ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করতেন তাঁরা। মাসে তাঁদের আয় ২ হাজার ২০০ থেকে ৬০০০ টাকা। দগ্ধ শ্রমিকদের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে দায়িত্বরত চিকিৎসক বলেন, দগ্ধ শ্রমিকদের কেউই আশঙ্কামুক্ত নয়। সবারই শ্বাসনালি পুড়ে গেছে। দু-এক দিন না গেলে কিছুই বলা যাচ্ছে না।

দগ্ধ শ্রমিকদের খোঁজ নিতে গতকাল সকালে বার্ন ইউনিটে আসেন ঢাকার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক সারোয়ার বারী। তিনি প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারের হাতে ১০ হাজার এবং নিহত শ্রমিকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা আর্থিক সাহায্য দেন। দুপুরে বার্ন ইউনিটে আসেন সাংসদ এনামুর রহমান। তিনি প্রত্যেক পরিবারের হাতে পাঁচ হাজার টাকা আর্থিক সাহায্য দেন।

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.