কবি নাজিম হিকমত লিখেছিলেন 'জেলখানার চিঠি'। বাংলায় তা অনুবাদ করেছিলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। ছোট ছোট বাক্যে, কিন্তু গভীর ইস্পাতদৃঢ় বেদনা ও মমতাময় অনুভূতিতে আর্দ্র কবিতাটি পড়তে পড়তে প্রত্যেক বাঙালিরই মনে হয় বঙ্গবন্ধুর কথা।

 মনে হয়, তিনিই যেন বলে চলেছেন কবিতার ভাষাতে_ 'আমি আছি মানুষের মাঝখানে, ভালবাসি আমি মানুষকে/ভালবাসি আন্দোলন/ ভালবাসি চিন্তা করতে,/আমার সংগ্রামকে আমি ভালবাসি/আমার সংগ্রামের অন্তস্তলে মানুষের আসনে তুমি আসীন/প্রিয়তমা আমার আমি তোমাকে ভালবাসি।' কেউই চান না এমন একটি স্থানে কোনোদিন কাটাতে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে বছরের পর বছর কাটাতে হয়েছে কারাগারের ভেতর। জেলের ভেতরেই জীবন দিতে হয়েছে জাতীয় চার নেতাকে। সেই কারাগার দেখতে স্বেচ্ছায় টিকিট কিনে গতকাল বুধবার থেকে পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের দিকে ছুটছে মানুষ। শিশু, কিশোর, তরুণ, প্রবীণ_ সব বয়সী নারী-পুরুষ রয়েছে সেই স্রোতে। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার স্মৃতিবিজড়িত কারাকক্ষ দেখতে এসেছে তারা।






পুরনো এ কেন্দ্রীয় কারাগারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ২২৮ বছরের ইতিহাস। সেই ইতিহাসে রয়েছে জানা-অজানা নানা অধ্যায়। তবে সাধারণ দর্শনার্থীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার কারাগার জীবন নিয়ে। কেননা তাদের উজ্জ্বল অবদানের কারণেই আজ স্বাধীন বাংলাদেশ। অথচ

সেই স্বাধীন দেশে ঘাতকের বুলেটে জীবন দিতে হয়েছে তাদের। কেমন ছিল তাদের কারাবাসের দিনগুলো, কারাগারের কোথায় থাকতেন তারা_ সেসব জানাতেই সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারে আয়োজন করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার দুর্লভ বিভিন্ন আলোকচিত্রের প্রদর্শনী 'সংগ্রামী জীবনগাথা'। প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে কারাগারও উন্মুক্ত করা হয়েছে দর্শনার্থীদের জন্য। তাই গতকাল সকাল থেকে বিকেল অবধি ছিল নানা বয়সী মানুষের ঢল। পুরনো ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কারাগারটিতে আগামী ৫ নভেম্বর পর্যন্ত একশ' টাকা দর্শনীর বিনিময়ে প্রবেশ করে দ্রষ্টব্য স্থানসমূহ ও প্রদর্শনীটি দেখতে পারবেন দর্শনার্থীরা।

গত ২৯ জুলাই কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তর হয়েছে কেরানীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুরে। ১ আগস্ট থেকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে পুরনো ঢাকার কারাগারকে। কিন্তু এ কারাগারের সঙ্গে ইতিহাসের অসংখ্য উপাদান জড়িয়ে থাকায় এটিকে ঘিরে নেওয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ। এরই অংশ হিসেবে কারাগারের ভেতর প্রথম কোনো প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। 'জেলহত্যা দিবস'কে কেন্দ্র করে প্রদর্শনীটির আয়োজন করেছে বাংলাদেশ জেল ও জার্নি নামের সংগঠন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে শহীদ হন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর পুরান ঢাকার কারাগারে জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে বন্দি করে রাখা হয়। এসব কক্ষে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ঢুকত না। ওই বছরের ৩ নভেম্বর রাতে (আজকের এই দিনে) কারাগারের একটি কক্ষে জাতীয় চার নেতাকে একত্র করার পর গুলি চালিয়ে তাদের হত্যা করা হয়।

পুরনো কারাগারের ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে হাতের ডানে শৈল্পিক শাপলা ও প্রতীকী মসজিদ। এর পাশ দিয়ে সোজা হেঁটে গেলে হাতের বাঁয়ে সরু একটি সড়ক। সেই সড়ক ধরে এগোতেই চোখে পড়ে দুটি ফাঁসির মঞ্চ ও কয়েকটি ভবন। বাঁ পাশের সড়ক ধরে এগোলেই শেষ মাথায় পাওয়া যাবে জাতীয় চার নেতার কারাবাস ও হত্যাকাণ্ডের ঐতিহাসিক সেলসমূহ। সেখানে এখন জাতীয় চার নেতার স্মৃতি কারা জাদুঘর গড়ে তোলা হয়েছে। এর সীমানার ভেতরে রয়েছে চার নেতার আবক্ষ মূর্তি। একটি বেদিও রয়েছে সেখানে_ যেখানে চার নেতার মরদেহ রাখা হয়েছিল। বেদিটিতে জাতীয় চার নেতা স্মরণে চারটি ছোট ব্লক নির্মাণ করা হয়েছে।

তবে জাদুঘরের ভেতরে প্রবেশ করার কোনো ব্যবস্থা নেই। লোহার রড বা গরাদের ফাঁক দিয়ে দেখতে হয়েছে জাতীয় চার নেতার স্মৃতিবিজড়িত কক্ষ চারটি। তাদের একটি লোহার গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক তরুণী দর্শনার্থী। ইডেন কলেজ পড়ূয়া ওই ছাত্রী জানালেন, 'এই লোহার গরাদ ধরে উপলব্ধি করার চেষ্টা করছি, জাতীয় চার নেতা কী করে এই নির্মম পরিবেশে কারাবাস করেছেন।' তাদের প্রতি নিক্ষেপিত বুলেটের চিহ্ন আজও লেগে রয়েছে কারা সেলের লোহার শিকে। এসব স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে 'মৃত্যুঞ্জয়ী জাতীয় চার নেতার ঘাতকদের বুলেটের চিহ্ন' শিরোনামে। এই সেলের সামনেই কথা হলো প্রবাসী বাঙালি কাজী আবু নাসেরের সঙ্গে। তিনি বলেন, 'ওই সময় আমি ছাত্র রাজনীতি করতাম। এ কারণে জাতীয় চার নেতার সঙ্গে বিভিন্ন সময় দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে।' তিনি জানান, 'বঙ্গবন্ধু ও প্রজ্ঞাবান এই চার নেতার কারণেই স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ। অথচ তাদেরই নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ বেদনা ভুলে যাবার নয়।' স্থানীয় একটি স্কুল থেকে সরাসরি দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে এসেছেন পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী আলী হোসেন। সন্তানদের ইতিহাসের সাক্ষী জাতীয় চার নেতার সেলগুলো দেখানোর জন্য নিয়ে এসেছেন তিনি। কথা হলো তার সঙ্গে আসা ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী জারিনের। বইপুস্তকে জেলহত্যার অনেক কথা জেনেছে সে। সেসব চিহ্ন চোখের সামনে দেখে আপ্লুত সে।

জাতীয় চার নেতার জাদুঘর থেকে সোজা বের হলে সামনে পড়ে যমুনা ভবন ও যমুনা ভবন-২। যমুনা ভবন-২ এর ভেতর কারাগারের বিচার ও বৈঠকের কাজ চলত। ভবনের ভেতরে নানা ধরনের কারুকাজ করা। আছে নানা উক্তি। রয়েছে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের জন্য পাঁচটি কনডেম সেল। বিশেষ তালা ঝোলানো রয়েছে কনডেম সেলগুলোতে।

এরই পাশে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কারা স্মৃতি জাদুঘর। ভেতরে বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ মূর্তি। আছে তার নিজের হাতে রোপিত কামিনী ও সফেদার গাছ। ছয় দফা দাবির প্রতীক হিসেবে সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে ছয়টি ছোট পিলার। এই স্মৃতি জাদুঘরে তার কারাবাসের সেল ও বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন দেখে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন দর্শনার্থীরা। বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত চৌকি, টেবিল, চেয়ার, খাবার পাত্র, ভাঙা চায়ের কাপ, সিলভারের কেটলি_ অনেক কিছুই যত্ন করে সংগ্রহ করা হয়েছে জাদুঘরে। তার অজু করার স্থানটিও সংরক্ষণ করা হয়েছে। রয়েছে তার 'রান্নাঘর' হিসেবে ব্যবহৃত ঘরটিও। বঙ্গবন্ধুর কারা স্মৃতি জাদুঘর দেখে আপ্লুত উত্তর কাফরুল থেকে আগত কয়েক বন্ধু রাসেল, কবির, জয়নাল ও মোহন। তারা বলেন, 'আগে বইয়ে পড়েছি, এবার স্বচক্ষে দেখলাম। নতুন করে উপলব্ধি করলাম জাতির পিতাকে।'

কারাগারে প্রবেশ করতেই অবশ্য দেখা যাবে বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত চশমা ও পাইপের প্রতীকী দুটি স্থাপত্য নিদর্শন। জাদুঘরে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর ব্যবহার করা দুটি চেয়ার। চোখে পানি চলে আসে বঙ্গবন্ধুর নিজের হাতে লেখা কয়েকটি চিঠি পড়ে। প্রদর্শনীর ১৪৫টি আলোকচিত্রের মধ্যে রয়েছে এমন সব দুর্লভ ছবি, যা এই প্রথম প্রদর্শিত হচ্ছে। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের শুরুতে বঙ্গবন্ধুর কারাবরণের সময় থেকে নানা সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের ছবি স্থান পেয়েছে এতে। আছে ১৯৬২ সালে স্বৈরাচারী আইয়ূব খানবিরোধী আন্দোলনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আতাউর রহমান খানের উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি। রয়েছে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, মামলা থেকে মুক্তি, শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেওয়ার ক্ষণ, '৭০-এর নির্বাচন, ১৯৭১-এর উত্তাল মার্চ, ৭ মার্চের ভাষণ, চার নেতার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন সময়ের, মুজিবনগর সরকার গঠনের, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা, বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করার, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসার নানা ছবি। এ ছাড়া দেশ গঠনে নানা কার্যক্রম, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সফর, বঙ্গবন্ধুর টানে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বাংলাদেশ ছুটে আসাসহ বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের নানা সময়ের স্মৃতিকাতর ছবিও ঠাঁই পেয়েছে এ প্রদর্শনীতে।

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.