বাগডুবি উচ্চ বিদ্যালয়। ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এ স্কুলে কোনো কম্পিউটার নেই। কম্পিউটার যেখানে নেই, সেখানে প্রতিষ্ঠানের দাপ্তরিক কাজ ডিজিটাল পদ্ধতিতে না হওয়ারই কথা।




 ইন্টারনেট, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম আর ডিজিটাল পাঠ্যক্রম তো কল্পনারও অতীত! শুধু এ বিদ্যালয় নয়, সারাদেশে এমন ছয় হাজার ১৬৩টি স্কুল-মাদ্রাসায় এখনও কম্পিউটার নেই। কম্পিউটার, ইন্টারনেট, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমসহ শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তরের ছোঁয়া লাগেনি ১০ হাজারেরও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। সব ধরনের স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসা তো বটেই, স্নাতকোত্তর কলেজ পর্যন্ত রয়েছে এই না থাকার তালিকায়। চলতি বছর প্রকাশিত বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বিপুলসংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনও তথ্যপ্রযুক্তির আওতার বাইরে থাকায় বিশ্বমানের শিক্ষা নিশ্চিতের দৌড়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, 'শিক্ষা যে গুরুত্ব পাচ্ছে না, এ পরিস্থিতি তারই প্রমাণ।'

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ  বলেন, 'এ চিত্র অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এর মানে শিক্ষা যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। একটি দেশের শিক্ষা খাতে মোট জাতীয় আয়ের (জিডিপি) ছয় শতাংশ বা বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে আদর্শ হিসেবে বিবেচিত। জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশও ২০০০ সালে এ প্রস্তাব অনুসমর্থন করেছে। অথচ এখানকার শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জাতীয় আয়ের দুই শতাংশের একটু বেশি। যদিও তাজাকিস্তানের মতো দেশে জিডিপির ৯ ভাগ, কিউবায় ১৯ ভাগ পর্যন্ত এ খাতে ব্যয় হয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান আফ্রিকার অনেক দরিদ্র দেশের চেয়েও কম।' তিনি বলেন, 'দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ আর বাড়বে না। এ পরিস্থিতিতে বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে পরিণত করে উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে পারে শিক্ষা। জাপান এ ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত।' শিক্ষার মানের প্রসঙ্গ টেনে এ শিক্ষাবিদ বলেন, 'আমাদের কম্পিউটার সিস্টেম বিদেশিরা চালায়; ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে কয়েকশত কোটি টাকা লুট হয়। এসব প্রমাণ করে আমরা কতটা দুর্বল অবস্থানে রয়েছি।'

ডিজিটাল উপকরণ অপর্যাপ্ত: তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে ইন্টারনেট, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, ডিজিটাল পাঠ্যক্রম ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির কোনো বিকল্প নেই। এদিকে ব্যানবেইসের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দেশের ২৭ ভাগ স্কুলে এখনও দাপ্তরিক কাজে কম্পিউটারের ব্যবহার হয় না। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি-বেসরকারি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও স্কুল অ্যান্ড কলেজ (স্কুল শাখা)। এ ধরনের মাদ্রাসা (দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল পর্যায়ের) ৪০ ভাগ এবং কলেজ (উচ্চ মাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর) ১১ ভাগ। ৩৯ ভাগ স্কুলে কম্পিউটারের কোনো শিক্ষকই নেই।

তথ্যপ্রযুক্তির মূল উপকরণ 'ইন্টারনেট' নেই এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয় হাজার ৭০৬টি। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পাঁচ হাজার ৪৮৫টি বিদ্যালয়, শতকরা হিসাবে যা ২৭ ভাগ। মাদ্রাসার সংখ্যা তিন হাজার ৯১৬টি এবং কলেজ ৩০৫টি। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম পায়নি ১০ হাজার ৩০৮টি প্রতিষ্ঠান। এগুলোর মধ্যে সর্বাধিক পাঁচ হাজার ৭০৪টি স্কুল, তিন হাজার ৮৬৫টি মাদ্রাসা এবং ৭৮৯টি কলেজ রয়েছে।


বিদ্যুৎ সংযোগ নেই পাঁচ হাজার প্রতিষ্ঠানে: দেশের প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনও বিদ্যুতায়নের বাইরে রয়ে গেছে। এর মধ্যে দুই হাজার ৯৬৮টি স্কুল, এক হাজার ৭৫১টি মাদ্রাসা এবং ১৪১টি কলেজ রয়েছে। কুড়িগ্রামের অলিপুরে অবস্থিত এমন একটি স্কুল গেন্দার আলগা উচ্চ বিদ্যালয়। এ স্কুলের প্রধান শিক্ষক আজিজুর রহমান জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় তারা এখনও কম্পিউটার নেননি। এ কারণে তাদের দাপ্তরিক নানা কাজে ছুটতে হয় পাশের ইউনিয়ন পরিষদে অথবা উপজেলা সদরে। শিক্ষা বোর্ড ও মন্ত্রণালয়ের অনেক সার্কুলার তারা সরাসরি ওয়েবসাইট থেকে জানতে পারেন না। মাধ্যমিক পর্যায়ের 'তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি)' বিষয়টি কীভাবে পড়ান জানতে চাইলে এই শিক্ষক বলেন, 'বিদ্যুৎ না থাকলেও স্কুলে কম্পিউটার শিক্ষক রয়েছেন। হাতে-কলমে পড়ানোর সুযোগ নেই, তাই তত্ত্বীয় (থিউরি) হিসেবেই তিনি শিক্ষার্থীদের এসব পড়িয়ে থাকেন।'


এসব ব্যাপারে তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার বলেন, 'শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য সরকারের কোনো পরিকল্পনা, রোডম্যাপ ও সমন্বিত কার্যক্রম নেই। পাঠ্যক্রম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, উপস্থিতি- এগুলোয় কবে যে তথ্যপ্রযুক্তির শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত হবে, তার কোনো পরিকল্পনাও নেই। ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে এটা এক ধরনের স্ববিরোধিতা।' তিনি বলেন, 'বিপুলসংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার না থাকা একটা লক্ষণ মাত্র। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত কম্পিউটার শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার আগেই এসব প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার দেওয়া উচিত ছিল। আর কম্পিউটারের শিক্ষক না থাকা তো রীতিমতো অপরাধ। এ জন্য ওই শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। কম্পিউটার শুধু থিউরি পড়ে শেখার জিনিস নয়।' হাতে-কলমে না শেখালে কীভাবে এ বিদ্যা আত্মস্থ হবে- প্রশ্ন রাখেন তিনি।


নীতিনির্ধারক ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য: এ ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, 'আমরা শূন্য থেকে শুরু করেছিলাম। এখন যতটুকু দেখছেন তা আমরাই করেছি। ৩৩ হাজার প্রতিষ্ঠানকে মাল্টিমিডিয়া সুবিধার আওতায় এনেছি। কম্পিউটার-ল্যাপটপ দিয়েছি।' তিনি বলেন, 'অনুমোদিত-অননুমোদিত সব প্রতিষ্ঠানই পরিসংখ্যানের আওতায় এসেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও এমপিওভুক্ত হয়নি। সব একসঙ্গে করা সম্ভবও নয়। তবে আমরা চেষ্টা করছি।'


শিক্ষা আইন করা হচ্ছে জানিয়ে নাহিদ বলেন, 'শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যায় এখনও ভারসাম্য আসেনি। কোনো জেলায় বেশি, কোনো জেলায় কম। এগুলোর সমতা আনতে সময় লাগবে। আইনে এসব বিষয় থাকবে। তখন ডিজিটালাইজড করতেও সুবিধা হবে।


মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এসএম ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, 'শিক্ষার ডিজিটালাইজেশনের ব্যাপারে কিছু প্রকল্প চলমান রয়েছে। টিচিং কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট (টিকিউআই-২) প্রকল্পের আওতায় দেড় হাজার কলেজে কম্পিউটার ল্যাব, ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া পেঁৗছানো হবে। সেকায়েপ নামে আরেকটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। আরও প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এসব প্রকল্পের আওতায় যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া পেঁৗছায়নি সেগুলোতে পেঁৗছে দেওয়া হবে। আশা করি, দু'এক বছরের মধ্যে লক্ষ্যে পেঁৗছানো যাবে।

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.