সড়ক পরিবহন আইনের আরও একটি 'চূড়ান্ত' খসড়া করেছে সরকার। আগের খসড়ার চেয়ে এটি আকারে যেমন ছোট হয়েছে, তেমনি কমেছে সাজা। 


সড়কে প্রাণহানির বিচার বিদ্যমান আইনের মতোই ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি অনুযায়ী করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ চালকের কারণে মৃত্যু হলেও তিন বছরের বেশি সাজা খাটতে হবে না। ক্ষতিপূরণের বিধান থাকলেও হতাহত ব্যক্তি কত ক্ষতিপূরণ পাবেন, তাও স্পষ্ট করা হয়নি।




১৮ অক্টোবর 'সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৬'-এর খসড়া মতামতের জন্য ওয়েবসাইটে দেয় সড়ক পরিবহন বিভাগ। এ বিভাগের সচিব এম এ এন ছিদ্দিক বলেন, 'এটিই চূড়ান্ত খসড়া; তার পরও মতামত নিচ্ছি। যদি কারও কাছ থেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো মতামত আসে, তবে তাদের সঙ্গে বসা হবে। এ ছাড়া খসড়াটি আর পরিবর্তন করা হবে না। অনুমোদনের জন্য তা মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে।' এই খসড়ায় আগামী ৮ নভেম্বর পর্যন্ত মতামত দেওয়া যাবে।


চলতি বছরের জানুয়ারিতে সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া প্রণয়ন করা হয়। গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় এর ওপর সব পক্ষের মতামত নেওয়া হয়। পরিবহন খাতসংশ্লিষ্ট সংগঠন, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এতে মতামত দেন। নাগরিক সমাজের দাবি ছিল, আইনে যেন কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়। তবে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি ছিল, সড়কে অপরাধের মামলা যেন জামিনযোগ্য ও আপসযোগ্য করা হয়। বিআরটিএ খসড়ার বিভিন্ন ধারা সংযোজন ও বিয়োজনের জন্য ১১৭টি সুপারিশ করে। সচিব জানান, এর ভিত্তিতেই খসড়াটি চূড়ান্ত করা হয়েছে।

নাগরিক সমাজ কঠোর সাজার দাবি জানালেও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে সড়কে প্রাণহানি ঘটালে বা কাউকে গুরুতর আহত করলে এর বিচার ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩০৪(খ) ধারায় করার বিধান রাখা হয়েছে। এ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি তিন বছরের জেল ও অর্থদণ্ড।


এ প্রসঙ্গে এম এ এন ছিদ্দিক বলেন, 'স্টেকহোল্ডারদের কাছ থেকেই এ প্রস্তাব এসেছে। মন্ত্রণালয় গ্রহণ করেছে মাত্র।' এর পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, 'দণ্ডবিধি মূল আইন। তাই সড়ক আইনে এর পরিপন্থী কিছু রাখা হয়নি। তার পরও মন্ত্রিসভা কিংবা সংসদের যদি মনে হয় সাজা কমছে, তবে তারা বাড়াতে পারবেন।'

এর আগেও তিন দফা সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া প্রণয়ন করা হয়। তবে তার কোনোটিই আইনে পরিণত হয়নি। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে বারবার কঠোর সাজার দাবি তোলা হলেও খসড়াগুলোয় ক্রমান্বয়ে কমানো হয়েছে সাজার প্রস্তাব। মন্ত্রণালয়ের ভাষায়, চূড়ান্ত খসড়ায় ২০১১ সালে বিশ্বব্যাংকের সুপারিশে প্রণীত খসড়া থেকে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু ধারা বাদ দেওয়া হয়েছে। এমনকি বাদ পড়েছে ২০১৩ সালে মন্ত্রণালয়ের গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটির বিভিন্ন সুপারিশ। খোদ সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও একাধিকবার বলেছেন, তিনিও চান কঠোর শাস্তির বিধান রেখে সড়ক পরিবহন আইন হোক, যাতে চালকরা সাজার ভয়ে আইন অমান্য না করেন। কিন্তু চূড়ান্ত খসড়ায় এর প্রতিফলন নেই।

বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে ২০১১ সালে প্রণীত 'সড়ক পরিবহন ও ট্রাফিক আইনে'র খসড়ায় বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর কারণে সংঘটিত দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সাজা ১০ বছর কারাদণ্ড করার সুপারিশ করা হয়। পরে ওই খসড়া পর্যালোচনায় ২০১৩ সালে গঠিত কমিটির সুপারিশেও আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিধান রাখা হয়। তবে সাজা কমিয়ে পাঁচ বছর করা হয়। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে কঠোর সাজার দাবি জানানো হলে এর বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে আন্দোলনে নামে নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বাধীন সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। আশির দশকে মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর আন্দোলনে সড়কে মৃত্যুর সাজা ১৪ বছর থেকে তিন দফায় কমিয়ে তিন বছর করা হয়।

খসড়ার ৫৩(১) ধারার অধীনে প্রণীত তফসিলের ৫৪(১) উপধারায় বলা হয়েছে, 'বিপজ্জনকভাবে অথবা বেপরোয়াভাবে মোটরযান চালানোর কারণে সংঘটিত দুর্ঘটনার ফলে প্রাণহানি ঘটলে বা গুরুতর আহত হলে এ-সংক্রান্ত অপরাধসমূহ দণ্ডবিধি ১৮৬০ অনুযায়ী অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে।' দায়ী চালকের লাইসেন্সের ২০ পয়েন্ট কর্তন করার বিধান রাখা হয়েছে খসড়ায়।

১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি ৩০৪(খ) ধারায় বলা হয়েছে, 'যে ব্যক্তি বেপরোয়াভাবে বা তাচ্ছিল্যের সহিত জনপথে যান বা অশ্ব চালাইয়া নরহত্যা নহে এমন মৃত্যু ঘটায়, সেই ব্যক্তি কারাদণ্ডে যাহার মেয়াদ তিন বছরের পর্যন্ত হইতে পারে বা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবে।'


তিন বছরের সাজার বিধানে হতাশা প্রকাশ করেন জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সদস্য বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ। তিনি বলেন, 'দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেলেই চালকের ১৪ বছরের জেল চাই না। সড়কের কারণে কিংবা পথচারীর ভুলেও দুর্ঘটনা হতে পারে। আমাদের দাবি ছিল, চালক দায়ী হলে সে ক্ষেত্রে কঠোর সাজার বিধান রাখা, যাতে চালকরা শাস্তির ভয়ে হলেও যেন সতর্কভাবে গাড়ি চালান। মন্ত্রীও একই কথা বলেছিলেন। কিন্তু সরকার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি।' তিনি অভিযোগ করেন, খসড়াটি আইনে পরিণত হলে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের স্বার্থরক্ষা ছাড়া আর কিছুই হবে না।


খসড়ায় ক্ষতিপূরণের বিষয়টি স্পষ্ট নয়। খসড়ার ৪১(১) ধারায় বলা হয়েছে, পরিবহন মালিক বা পরিচালনাকারী দুর্ঘটনায় হতাহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে। তবে সর্বোচ্চ কত টাকা ক্ষতিপূরণ দেবে, তা বলা হয়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ ছিল, সরকার সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে দেবে। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া না গেলে 'মোটরযান দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত তহবিল' থেকে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এসব সুপারিশ মন্ত্রণালয় গ্রহণ করেনি।


চূড়ান্ত খসড়ায় গাড়ি ও যাত্রীর বীমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ৪৮(২) ধারায় বলা হয়েছে, পরিবহন মালিক বা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান দুর্ঘটনায় হতাহতের ক্ষতিপূরণের টাকা ৯০ দিনের মধ্যে বীমা কোম্পানির কাছ থেকে আদায় করে দেবে। দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা ব্যয় বহন পরিবহন কর্তৃপক্ষ করবে।


এসব ধারা অবাস্তব বলছেন সৈয়দ আবুল মকসুদ। তিনি বলেন, 'কোনো গাড়ি যদি কাউকে চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়, তাহলে ক্ষতিপূরণ দেবে কে? সাধারণত গরিব মানুষই দুর্ঘটনার শিকার হন। এ দেশে বীমা কোম্পানির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়া এমনিতেই কঠিন। মালিকরা টাকা তুলে দেবেন, এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়।'


খসড়ায় সড়ক-সংক্রান্ত অপরাধকে জামিনযোগ্য ও আপসযোগ্য করা হয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা পুলিশের অতিরিক্ত সুপারিনটেনডেন্ট সমমর্যাদার কর্মকর্তা দুই পক্ষের মধ্যে মীমাংসা করে দিতে পারবেন। বড় অপরাধে (তিন মাসের কারাদণ্ডের ঊধর্ে্ব) বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করতে পারবে পুলিশ।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, 'কঠোর আইন করা হবে- এ কথা বলে পাঁচ বছর পার করা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে আইন করা হচ্ছে, তা দায়সারা গোছের। এতে সড়কে শৃঙ্খলা আসবে না।'


২০১১ সালে 'সড়ক পরিবহন ও ট্রাফিক আইন' নামে খসড়ায় ২২টি অধ্যায় ও ৩৭২টি ধারা ছিল। ২০১৩ সালে গঠিত কমিটি তা কমিয়ে ১৫ অধ্যায় ও ২৪২টি ধারার খসড়া প্রণয়ন করে। সর্বশেষ খসড়ায় আইনটি ১৩টি অধ্যায় ও ৭৩ ধারায় নামিয়ে আনা হয়েছে।


আগের খসড়ায় পেশাদার চালকের সর্বোচ্চ বয়স ৬০ নির্ধারণ করা হয়েছিল। চূড়ান্ত খসড়ায় বয়সের বাধা বাতিল করা হয়েছে। শারীরিক ও মানসিকভাবে সক্ষম যে কেউ লাইসেন্স পাবে। ভুয়া লাইসেন্স কিংবা সমিতির দেওয়া 'লাইসেন্স' ব্যবহার করে গাড়ি চালানোর শাস্তি এক বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে চূড়ান্ত খসড়ায়। গাড়ির আকার পরিবর্তন, যেমন আসনসংখ্যা বৃদ্ধি, অ্যাঙ্গেল, হুক সংযোজনের জন্য এক বছরের জেল অথবা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ড ও ১৫ হাজার টাকা জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে। অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর সাজা এক বছরের জেল ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা।


চালকের পাশাপাশি কন্ডাক্টরদের লাইসেন্স নেওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। চালক ও কন্ডাক্টরের নিয়োগপত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। চালকদের লাইসেন্সের বিপরীতে ১০০ পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। আইন ভঙ্গ করলে শাস্তির পাশাপাশি পয়েন্ট কাটা হবে। এভাবে পুরো পয়েন্ট কাটা হয়ে গেলে লাইসেন্স স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে। লাইসেন্স বাতিল হলে এক বছর পর আবারও লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবেন চালক। তবে দু'বার লাইসেন্স বাতিল হলে আর কখনোই লাইসেন্স পাবেন না ওই চালক।

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.