কথাবার্তায় প্রচণ্ড ঝাঁজ_ ওটাই ব্র্যান্ড ছিল তার। এমনকি পূর্বপুরুষের দেশ ভারতও রেহাই পায়নি সে ঝাঁজ থেকে। বলেছিলেন, ওটা হলো 'অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস।'





 এমন আলোচিত ব্যক্তিত্বের কথা শুনতে নির্ধারিত সময়ের ঘণ্টাখানেক আগেই কানায় কানায় ভরে গিয়েছিল বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তন। তবে নির্ধারিত সময়েই মঞ্চে এলেন স্যার বিদ্যাধর সুরজপ্রসাদ নাইপল। হুইল চেয়ারে করে তাকে মঞ্চে নিয়ে এলেন স্ত্রী নাদিরা নাইপল। সাহিত্যে অনবদ্য সৃষ্টিশীলতার জন্য নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব নাইপলের আগমনে মিলনায়তনের সবাই উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানালেন তাকে।


বৃহস্পতিবার ঢাকা লিট ফেস্ট উদ্বোধন করতে গিয়েও খানিকক্ষণ কথাবার্তা বলেছিলেন তিনি। তবে অত অল্প কথায় কারও মন ভরেনি।

গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রায় এক ঘণ্টার বক্তব্যে নিজের লেখক জীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে, বিভিন্ন বিষয়স্পর্শী কথোপকথনে আর হাস্যরসে সবাইকে মুগ্ধ করলেন তিনি, সঞ্চারিত করলেন নতুন নতুন বোধ। মুগ্ধ দর্শকের মুহুর্মুহু করতালিতে বারবার মুখরিত হলো মিলনায়তন। উৎসব পরিচালক আহসান আকবরের সঞ্চালনায় দ্বিতীয় দিনের শেষ এ অধিবেশনের শিরোনাম ছিল 'দ্য রাইটার অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড।'

নিজের সৃষ্টিশীলতার কথা জানাতে গিয়ে নাইপল বললেন, 'সৃষ্টিশীল যে কোনো কাজের পেছনে কাজ করে অদ্ভুত পাগলামি। ওটা না থাকলে সৃষ্টিশীল কাজ হয় না। আমার লেখালেখির জীবন ছিল জাদুর মতো। আমি ভাগ্যবান যে, সেই পথে হেঁটেছি। লেখক হতেই চেয়েছি আমি। সে ইচ্ছে তৈরি হয়েছিল আমার লেখক বাবাকে দেখে। আমার অনেক লেখায়ই আমার বাবার জীবনের কাহিনীর ছাপ রয়েছে। কিন্তু শুরুতে আমি জানতাম না, কী লিখব।' তিনি বলেন, 'আমি বুঝতে পারলাম, এর জন্য আমাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। আমার কাছে বিষয়টি খুব বিব্রতকর ছিল। লন্ডনের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতাম। নিজের ব্যাপারে নিজেই বিরক্ত হতাম। এক সময় বিবিসির লন্ডন অফিসের ডার্করুমে বসে টাইপরাইটারে লিখতে শুরু করলাম। নিজেকে বললাম, আমি ততক্ষণ পর্যন্ত এ ঘর ছেড়ে যাব না, যতক্ষণ পর্যন্ত না জানি যে আমার লেখাটি কী দাঁড়াচ্ছে।'

নাইপল বলেন, "আমি যে লেখালেখি করেছি, তা 'ননসেন্স' ছাড়া আর কিছুই নয়। আবার এটাও বলতে হয়, কোনো কিছুই খুব সহজ নয়। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে, তারপরই একটা কিছু দাঁড়ায়। একটা সময় আমি বুক পকেটে নোটবই নিয়ে ঘুরতাম এবং যাদের ভিন্নরকম মনে হতো, তাদের সঙ্গে কথা বলতাম এবং সেগুলো লিখে রাখতাম।'

নাইপলের বক্তব্যের মাঝখানে তার বিখ্যাত বই 'এ হাউজ ফর মি. বিশ্বাস'-এর পাণ্ডুলিপি নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেন নাদিরা নাইপল। তিনি বলেন, 'এ বইয়ের পাণ্ডুলিপি ভুল করে রান্নাঘরে ফেলে আমরা প্যারিস চলে গিয়েছিলাম। এর আর কোনো কপি ছিল না। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ পাণ্ডুলিপিটির কথা মনে পড়ে যায়। তখন আমি সেটি উদ্ধারের ব্যবস্থা করি। পরে এ বইটি তুমুল পাঠকপ্রিয়তা পায়।"

গতকাল ছুটির দিনে বাংলা একাডেমি চত্বরের লিট ফেস্টের ছয়টি মঞ্চেই ছিল ৩৭টি অধিবেশন। উৎসবে ১৮ দেশের ৬৬ জন এবং বাংলাদেশি দেড় শতাধিক সাহিত্যিক-লেখক-গবেষক অংশ নিচ্ছেন। যাত্রিক আয়োজিত এ উৎসবে সহযোগিতা করেছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

'সাহিত্য যখন সবার' :গতকাল দুপুর ২টায় মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় 'সাহিত্য যখন সবার' শীর্ষক অধিবেশন। আন্দালিব রাশদীর সঞ্চালনায় এতে অংশ নেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, মঈনুল আহসান সাবের, সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ইমতিয়ার শামীম।

ইমদাদুল হক মিলন বলেন, 'সাহিত্য সবার জন্য নয়। যদি সবার জন্য হতো, সবার কাছে পেঁৗছতে পারত, তবে পৃথিবী বদলে যেত। কেননা সাহিত্যের কাজ তো মানুষের মনোজগতকে পরিবর্তন করা।'

মঈনুল আহসান সাবের বলেন, 'সাহিত্য সবার কাছে পেঁৗছতে পারে না। পারবেও না। তবে লেখকরা আকাঙ্ক্ষা করেন তাদের সৃষ্টিকর্ম সবাইকে স্পর্শ করুক।'

সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, 'সাহিত্য সবার জন্য। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রূপে সাহিত্য ভূমিকা রেখেছে।'

ইমতিয়ার শামীম বলেন, 'কোনো লেখকই পাঠকের কথা ভেবে লেখেন না। লেখক তার নিজের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি, অভিজ্ঞান দিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি করেন।'

দুপুর ২টায় ফেস্টের লনে 'মঞ্চ যখন আমার' শিরোনামের অধিবেশনে অভিনেত্রী বন্যা মির্জার সঞ্চালনায় আলোচনা করেন সারা যাকের, মিতা হক ও সামিনা লুৎফা।

'ইন আদার ওয়ার্ডস :লাইব্রেরি অব বাংলাদেশ' :সকাল ১০টায় কে কে টি স্টেজের এ অধিবেশনে অংশ নেন ২০১৬ সালের ম্যান বুকার পুরস্কারজয়ী সাহিত্যিক ডেবোরাহ স্মিথ, অরুণাভ সিনহা, চার্লস টর্নার ও কায়সার হক। সঞ্চালনা করেন ড্যানিয়েল হার্ন। একই সময় ব্র্যাক মঞ্চে 'ক্যান ইন্ডিয়া স্পিক' শিরোনামের অধিবেশনে দ্য ইকোনমিস্ট পত্রিকার দক্ষিণ এশিয়ার ব্যুরো চিফ ম্যাক্স রডেনবেকের সঞ্চালনায় আলোচনা করেন নরেশ ফার্নান্দেজ, মঞ্জুলা নারায়ণ ও শ্রীরাম কারি। সোয়া ১১টায় মূল মঞ্চে 'দ্য নিউ ওয়ার্ল্ড ডিজঅর্ডার' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। জাস্টিন রোলাটের সঞ্চালনায় এখানে আলোচনা করেন ম্যাক্স রোডেনবেক, বেন জুদাহ, রোজামান আরউইন ও ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক জাফর সোবহান। একই সময়ে কে কে টি স্টেজে 'নারী ও নারিত্ব'বিষয়ক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সাংবাদিক উদিসা ইসলামের সঞ্চালনায় এতে অংশ নেন নাসিমা আনিস, সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়, পাপড়ি রহমান ও সাদিয়া মাহজাবিন ইমাম। একই সময় লনে কার্তিকা ভিকের উপস্থাপনায় কথোপকথনে অংশ নেন পুলিৎজার জয়ী সাহিত্যিক বিজয় শেষাদ্রী। ব্র্যাক মঞ্চে 'সুফি সোল' শীর্ষক আলোচনায় আমিনা ইয়াকিনের সঞ্চালনায় কথা বলেন সাদিয়া দেলভি ও অধ্যাপক সলিমউল্লাহ খান। বিকেল সোয়া ৩টায় অনুষ্ঠিত হয় 'টিকে থাকার আজ কাল পরশু' শীর্ষক অধিবেশন। পশ্চিমবঙ্গের নিউরো সায়েন্টিস্ট গার্গো চট্টোপাধ্যায়ের সঞ্চালনায় এতে অংশ নেন ফিরোজ আহমেদ, চলচ্চিত্রকার ইন্দ্রনীল রায় চৌধুরী, সাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামাল ও মানস চৌধুরী। একই সময় লনে 'জীবনের কবিতা' শীর্ষক আলোচনায় নিজের জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে কথা বলেন নন্দিত কবি নির্মলেন্দু গুণ। সঞ্চালনা করেন শামীম রেজা।

দিনভর সাংস্কৃতিক আয়োজন :গতকাল সারাদিনই লিট ফেস্টের নানা মঞ্চে ছিল বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দিনের প্রথমভাগে আফসারউদ্দিন আলী চিশতি ও তার দল পরিবেশন করে মারফতি গান। এর পর সাধনার নৃত্যশিল্পীরা মঞ্চস্থ করেন নৃত্যনাট্য 'প্লাবতীর আখ্যান'। সকাল ১০টায় লনে ইংরেজি কবিতা আবৃত্তি করেন শেহজার দোজা, সৈয়দা আহমেদ, ফাতেমা হাসান, জেফরি ইয়াং ও আহমাতজান ওসমান। বিকেল সোয়া ৩টায় বিদ্যা শাহের পরিবেশনায় ছিল 'জলসা'। বিকেল সাড়ে ৪টায় বয়াতি শাহ আলম ও তার দল পরিবেশন করে পালাগান। দিনের শেষ আয়োজনে বটতলায় সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী বব ডিলানের প্রতি সম্মান জানাতে সঙ্গীত পরিবেশন করে ব্যান্ডদল স্টোন ফ্রি।

আজ শনিবার এবারের লিট ফেস্টের শেষ দিন। আজ বিকেল সাড়ে ৫টায় মূল মঞ্চে জেমকন সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হবে। সাড়ে ৬টায় সমাপনী অনুষ্ঠান ও রব ফকিরের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শেষ হবে এ সাহিত্য উৎসব।

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.