'২৮ সেপ্টেম্বর নাসিমা আক্তার প্রিয়াকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় প্রবেশ করি। বসেছিলাম বানরের খাঁচার পাশে একটি গাছের আড়ালে। দুইজনে গল্পের ফাঁকে প্রস্রাব করার কথা বলে নাসিমার পাশ থেকে উঠে পড়ি। আমার পাঞ্জাবির পকেটে রাখা ছিল এসিড ভর্তি বোতল।


 বোতলটি বের করে একটু আড়াল থেকে নাসিমার ওপর ছুড়ে মারি। চিৎকার করে নাসিমা দুই চোখ বন্ধ করে রাখলে হাতসহ শরীরের অন্যান্য জায়গা লক্ষ্য করে এসিড নিক্ষেপ করা হয়। একটু পর নাসিমার কাছে গিয়ে সুজন জানতে চান তার কী হয়েছে? আশপাশের লোকজন কী ঘটেছে জানতে চাইলে সুজন জানান, হিজড়ার

মতো এক লোক তার স্ত্রীর গায়ে তরল কিছু ছুড়ে দৌড়ে পালিয়েছে।' এসিড ছোড়ার কথা স্বীকার করে গত ১৫ অক্টোবর সুজন আদালতে জবানবন্দি দেন। 



গত ২৮ সেপ্টেম্বর মিরপুর চিড়িয়াখানায় নাসিমা আক্তার প্রিয়ার (২৪) ওপর এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এসব কথা বলেন 'কবিরাজ' সুজন হোসাইন। যদিও এসিড নিক্ষেপের পর দায়ের করা মামলায় নাসিমার স্বামী হিসেবে নিজের পরিচয় উল্লেখ করেন সুজন। নাসিমা ও তার পরিবারের সদস্যরা প্রথমে পুলিশের কাছে সুজনের আসল পরিচয় গোপন করেছিল। কারণ নাসিমা ও তার পরিবারের সদস্যদের জানান, নাসিমা তার স্বামী নন, এটা যদি পুলিশ ও চিকিৎসকরা জানতে পারে তাহলে জিন তাদের বড় ধরনের ক্ষতি করবে। এছাড়া পুলিশও মামলা নিতে রাজি হবে না। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি এমন ভয় দেখিয়ে নাসিমাকে স্ত্রী সাজিয়ে মামলা করেই গা-ঢাকা দেন সুজন। মামলার তদন্তের এক পর্যায়ে নাসিমাই পুলিশের কাছে স্বীকার করেন, সুজন তার স্বামী নন। এরপরই তাকে ঘিরে সন্দেহ বাড়তে থাকে পুলিশের। কবিরাজের রোগী সেজে গত ১৩ অক্টোবর শাহ আলী থানা পুলিশের একটি দল ভণ্ড কবিরাজকে পাবনা থেকে গ্রেফতারের পর বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। সুজন জানান, নাসিমাকে উচিত শিক্ষা দিতে পূর্বপরিকল্পিতভাবে এসিড নিক্ষেপের ছক তৈরি করেন তিনি। নাসিমা তার সংসার ভাঙতে চেয়েছিল। আর নাসিমা পুলিশকে জানান, দুঃসম্পর্কের আত্মীয় ও পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে সুজনের সঙ্গে তার 'সম্পর্ক' ছিল। এক পর্যায়ে তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেয় সুজন। হয়ত বিয়ে করতে রাজি না হওয়ায় তার ওপর এসিড ছুড়েছে। এরপর ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে জিনের ভয় দেখিয়ে স্বামী পরিচয়ে মামলাও করে। 

জানা গেছে, সুজনের বাড়ি পাবনা জেলা সদরের নাজিরপুরে। আট বছর আগে বিয়ে করেন। এক সন্তানের জনক। প্রায় ১০ বছর থেকে গ্রামে কবিরাজি করেন। এলাকায় জিন-পরীর কবিরাজ নামে পরিচিত। জিন-পরী হাজির করে মানুষের ভবিষ্যদ্বাণী বলতে পারেন বলে প্রতারণা করেন। বাড়িতেই নিয়মিত রোগী দেখেন। জিন দিয়ে চোরাই মালামাল উদ্ধার ও চোরকে হাজির করার নামেও করেন প্রতারণা। বছরখানেক আগে ছোট বোনের চিকিৎসা করাতে সুজনের বাড়ি যান নাসিমা। সেই সূত্র ধরে নাসিমার সঙ্গে তার 'সম্পর্ক' তৈরি হয়। ধীরে ধীরে সেই সম্পর্ক 'গভীর' হতে থাকে। মাস ছয় আগে সুজন বিয়ের প্রস্তাব দিলে নাসিমা তা প্রত্যাখ্যান করেন। গত ৯ সেপ্টেম্বর রামপুরায় নাসিমার ভাইয়ের বাসায় চুরি হয়। খবর পেয়ে চোরাই মালামাল উদ্ধারের জন্য ২০ সেপ্টেম্বর সুজন রামপুরায় নাসিমার ভাইয়ের বাসায় আসেন। চার দিন থাকার পর ২৪ সেপ্টেম্বর জিন হাজিরের কথা বলে তিনি গ্রামের বাড়ি পাবনায় যান। পাবনা শহরের একটি অটোবাইক মেরামতের দোকান থেকে এক বোতল এসিড কেনেন। ওই এসিড নিয়ে ২৭ সেপ্টেম্বর ফের রামপুরায় নাসিমার ভাইয়ের বাসায় আসেন। ২৮ সেপ্টেম্বর সকালে নাসিমার মা রিনাকে সুজন জানান, চোরাই মালপত্রের খোঁজ পাওয়া গেছে। সেগুলো উদ্ধারে নাসিমাকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় যেতে চান। সরল বিশ্বাসে মেয়েকে তার সঙ্গে পাঠান রিনা। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী এসিড নিক্ষেপের পর দগ্ধ নাসিমাকে নিয়ে প্রথমে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেন তিনি। সেখান থেকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। স্ত্রী পরিচয়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করান। তার মা ও ভাইকে সুজন নিজেই মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানিয়ে হাসপাতালে আসতে বলেন। নাসিমার বড় ভাই সহিদুল ইসলাম জানান, হাসপাতালে সুজন তাদের বলেছিলেন, স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে নাসিমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি যে তার স্বামী নন, এটা ডাক্তার, পুলিশ জেনে গেলে জিন তাদের বড় ধরনের ক্ষতি করে দেবেন। এ আতঙ্কে প্রথমে তারা বিষয়টি চেপে যান। 

জবানবন্দিতে তিনি এসিড নিক্ষেপের কথা স্বীকার করলেও কৌশলে নাসিমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। জবানবন্দিতে বলেন, 'নাসিমা তাকে ফাঁদে ফেলেছিলেন। তার স্ত্রীকে ফোন দিয়ে তার সংসারও ভাঙতে চান নাসিমা।' এসব কারণেই প্রতিশোধ নিতে তার শরীরে এসিড ঢেলে দেন সুজন। তিনি নাসিমাকে ফাঁসাতে চাইলেও পুলিশ তদন্তে জানতে পারে, সুজন একজন প্রতারক। কবিরাজের আড়ালে তিনি নারীদের সঙ্গে প্রতারণা করেন। 

শাহ আলী থানার ওসি আনোয়ার হোসেন জানান, এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় তরুণীকে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে সুজন বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন। ৩০ সেপ্টেম্বর নাসিমা তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের জানান, সুজন তার স্বামী নন। এর পরই তদন্তে মোড় নেয়। প্রথমে সুজন মামলার বাদী হওয়ায় প্রথমে তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। তার স্বীকারোক্তির পর সেই মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এরপরই নাসিমার মা রিনা বাদী হয়ে সুজনকে আসামি করে থানায় মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তিনি এখন কারাগারে রয়েছে। 

সুজনের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে নাসিমা বলেন, 'আমার জীবন শেষ করে দিয়েছে। বাকি জীবনটা পোড়া ক্ষত নিয়েই কাটাতে হবে। আমি তো শেষ হয়ে গেছিই, সুজন যেন রেহাই না পায়। তার এমন শাস্তি হওয়া দরকার, যেন আর কোনো তরুণীকে তার শিকার হতে না হয়।'

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.