ক্ষণে ক্ষণে জ্বলে উঠছে গেরুয়া আলো। প্রতীক্ষার সামান্য মুহূর্তও মনে হচ্ছে কত দীর্ঘ! বিশাল মঞ্চের সামনে দৃষ্টিজুড়ে কেবলই মানুষ। লোকনৃত্য দিয়ে শুরু হওয়ার পর ফোকসম্রাজ্ঞী মমতাজ বেগমের গানে শেষ হলো ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসবের প্রথম দিনের আয়োজন।




 শুরুর পর থেকে শেষ হওয়া পর্যন্ত শুধুই হারিয়ে যাওয়া সুরের জালে। মাটির গানের ঐশ্বরিক সুরের ইন্দ্রজালে তন্ময় শ্রোতা-দর্শকের অংশগ্রহণে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্দা উঠল ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসবের। হেমন্তের হালকা শিশিরসিক্ত রাত জাগ্রত হলো মৃত্তিকার টানে। রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে দ্বিতীয়বারের মতো এ উৎসবের আয়োজন করেছে সান ইভেন্টস। মেরিল নিবেদিত এ উৎসবে সহযোগিতা করছে গ্রামীণফোনের জিপি মিউজিক, ঢাকা ব্যাংক ও মাইক্রোসফট। এবারের উৎসবে অংশ নিচ্ছেন বাংলাদেশসহ ছয় দেশের শতাধিক শিল্পী।



সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার কিছুক্ষণ পর উপস্থাপিকা অনুষ্ঠান শুরু করলেন। পল্লবী ড্যান্স গ্রুপের শিল্পীরা মঞ্চে এলেন লোকনৃত্য নিয়ে। এরপর মঞ্চে এলেন আবদুর রহমান বাউল। হবিগঞ্জের এ শিল্পী শাহ্ আবদুল করিমের প্রধান শিষ্য ছিলেন। প্রকৃতি থেকে প্রতিনিয়ত প্রেরণাদীপ্ত এ শিল্পী এসেই গেয়ে উঠলেন, 'আমি তোমার হইতে পারলাম না'। দেহতত্ত্ব ও ভাবতত্ত্বের মধ্য দিয়ে জীবনের অর্থ খুঁজে ফেরা এ শিল্পীর আরও কয়েকটি গানের পর শুরু হলো উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা।

উদ্বোধন পর্বে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অতিথি ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র

আনিসুল হক, গ্রামীণফোনের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা ইয়াসির আযমান, ঢাকা ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এবং মাইক্রোসফটের বাংলাদেশ প্রধান সোনিয়া বশির কবির। স্বাগত বক্তব্য রাখেন স্কয়ার টয়লেট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সান ইভেন্টসের চেয়ারম্যান অঞ্জন চৌধুরী।

অর্থমন্ত্রী বলেন, 'প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের সংস্কৃতিচর্চা আমাদের স্বভাবজাত ব্যাপার। আমাদের রুচি অত্যন্ত পরিশীলিত। নভেম্বর মাস আমাদের উৎসবের মাস, যার সূচনা এ উৎসব দিয়ে।'

মেয়র আনিসুল হক বলেন, "আজকের এ আয়োজনে আমি 'কাবাব মে হাড্ডি'। সকাল থেকে পাবলিক টয়লেট উদ্বোধন, জমি দখল, রাস্তা দখল করে এখানে এসে নিজেকে গর্বিত মনে হচ্ছে। এ ধরনের আয়োজন তরুণদের উদ্বুব্ধ করবে সুন্দরের পথে।"

অঞ্জন চৌধুরী বলেন, 'এ উৎসব শুধু এ আর্মি স্টেডিয়ামে নয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে সারাবিশ্বের মানুষও দেখতে পারছেন। এ উৎসবের জন্য প্রধানমন্ত্রী আমাদের শুভকামনা জানিয়েছেন, তাকে ধন্যবাদ জানাই। সেই সঙ্গে সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীকেও ধন্যবাদ জানাই। তাদের সহযোগিতা ছাড়া এ উৎসব করতে পারতাম না।'

উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা শেষে মঞ্চে আসেন লালনের কুষ্টিয়ার শিল্পী টুনটুন বাউল। তার কণ্ঠে শোনা গেল 'বলো স্বরূপ কোথায় আমার সাধের পিয়ারি', 'কে বানাইলো এমন রংমহল খানা', 'মানুষ ছাড়া খ্যাপারে তুই', 'মহাকাজে মহা ধন্য'সহ আরও বেশ কিছু গান।

টুনটুন বাউলের পরিবেশনা শেষে মঞ্চে আসেন স্কটল্যান্ডের সাইমন থ্যাকার্স সাভারা কান্তি। তাদের সঙ্গে জোট বাঁধেন ভারতের রাজু দাস বাউল ও বাংলাদেশের ফরিদা ইয়াসমিন। তবলা, বায়া ও একতারার মতো দেশীয় বাদ্যের সঙ্গে পাশ্চাত্যের গিটারের সুরের মিশেলে পুরো পরিবেশনাটি হয়ে ওঠে অনবদ্য। শুরুতেই রাজু দাস বাউল গেয়ে শোনান 'পার করো আমারে', 'তোমরা কুঞ্জ সাজাও গো/আজ আমার প্রাণনাথ আসিতে পারে', 'ভ্রমর কইও গিয়া' গানগুলো। এর পর দলীয় যন্ত্র পরিবেশনা ছিল অসাধারণ। এর পর সঙ্গীত পরিবেশন করেন বাংলাদেশের শিল্পী ফরিদা ইয়াসমিন। তিনি পরিবেশন করেন 'আর কি হবে মানবজনম', 'ধন্য ধন্য বলি তারে'সহ আরও কয়েকটি গান।

এর পর মঞ্চে আসেন পাকিস্তানের শিল্পী জাভেদ বশির। হিন্দুস্তানি ক্লাসিক্যাল ঘরানার এ শিল্পী বাংলাদেশে বিশেষ পরিচিতি পান বলিউডের 'ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন মুম্বাই দোবারা' চলচ্চিত্রের 'ইয়ে তুনে ক্যায়া কিয়া' গানের মধ্য দিয়ে। তিনি শুরুতেই শাস্ত্রীয় সুরে মুগ্ধ করেন দর্শক-শ্রোতাদের। এর পর গেয়ে শোনান 'নিসা', 'তেরা নাম যাব ভি লিয়া', 'সাজনা তেরে বিনা', 'ইয়ে তুনে ক্যায়া কিয়া', 'দামাদাম মাস্ত কালান্দার'সহ আরও কয়েকটি গান।

উৎসবের প্রথম দিনের মূল ও শেষ আকর্ষণ ছিলেন ফোকসম্রাজ্ঞী মমতাজ বেগম। গানের মঞ্চ থেকে রাজনীতির মাঠ_ সবখানে সফল এ শিল্পীর নাম ঘোষণা হতেই হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ে পুরো আর্মি স্টেডিয়াম। প্রায় এক ঘণ্টার পরিবেশনায় তিনি গেয়ে শোনান জনপ্রিয় সব লোকগান। শ্রোতারাও কণ্ঠ মেলান প্রতিটি গানে। পরিবেশনার শুরুতেই মমতাজ গেয়ে শোনান ফকির কালু শাহের 'ভুইলো না মন তাহারে'। এর পর তিনি একে একে 'মন মিনারায় পড়েছে আজান'সহ বিভিন্ন বাউল সাধক ও নিজের গান গেয়ে শোনান।

এদিকে, বিকেলের পর থেকে দর্শক আগমনের যে যাত্রা শুরু হয় তা রাত অবধি ছিল। রাত ১০টায় স্টেডিয়ামের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে ভেতরে তখন উপচেপড়া ভিড়। শিকড়ের গান শুনতে আসা দর্শককে কিছুটা বিরক্তির উদ্রেক ঘটিয়েছে সাউন্ড ব্যবস্থাপনার ত্রুটি। সেই সঙ্গে উৎসবস্থলে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় অনেককে পড়তে হয় সমস্যায়। তবে মধ্যরাতে শেষ হওয়া এ আয়োজনে আয়োজকদের ব্যবস্থাপনায় ছিল ঘরে ফেরার ব্যবস্থা।

দ্বিতীয় দিনের আয়োজন :আজ শুক্রবার ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসবের দ্বিতীয় দিনের মূল আকর্ষণ ভারতের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কৈলাস খের। বাংলাদেশের শিল্পীদের মধ্যে আজ গাইবেন জালাল ও লতিফ সরকার। আরও থাকছে বাউল শফি মণ্ডল আর লাবিক কামাল গৌরবের যুগলবন্দি। নিজেদের গান নিয়ে আসবে ভারতের লোকব্যান্ডদল ইন্ডিয়ান ওশেন। লোকজ সুরের সঙ্গে ফ্লামেঙ্গো নাচের যূথবদ্ধ পরিবেশনা থাকছে স্পেনের কারেন লুগো ও রিকার্ডো মোরোর।

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.