১০ নভেম্বর হায়হায় কোম্পানি 'অরবিট মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডে'র কর্মকর্তারা অফিসে তালা লাগিয়ে চম্পট দিয়েছেন।






রাস্তায় কাগজ কুড়িয়ে তা বিক্রি করে প্রতিদিন ৫০ টাকা সমিতিতে জমা দিতেন তাছলিমা। বছর শেষে মূলধনসহ ১০ শতাংশ লাভের আশায় স্বামী পরিত্যক্ত তাছলিমা চলতি বছরের জানুয়ারিতে সমিতিতে নাম লেখান। প্রায় ১৬ হাজার টাকা জমা হয়েছিল সঞ্চয় হিসাব নম্বরে। তার একমাত্র ছেলে তাইজুলের বয়স পাঁচ বছর। তাকে নিয়েই তিনি প্রতিদিন সকালে বের হন কাগজ কুড়াতে। ছেলের ভবিষ্যতের চিন্তায় তার টাকা জমানোর পরিকল্পনা। তবে হতদরিদ্র তাছলিমার সেই স্বপ্ন পূরণ হলো না।  তাছলিমা থাকেন রাজধানীর কাফরুলের বউবাজার বস্তিতে।


শুধু তাছলিমা নয়, রাজধানীর কাফরুল ও ভাসানটেক এলাকার অন্তত তিন হাজার ব্যক্তির প্রায় ১৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে লাপাত্তা অরবিট মাল্টিপারপাস। প্রতিষ্ঠানের প্রধান মিজানুর রহমান ওরফে মিজান ও তারিকুল ইসলাম ওরফে তারেকসহ তাদের সহযোগীদের কোনো হদিস নেই। টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় একাধিক ভুক্তভোগী থানায় জিডি করলেও পুলিশের তদন্তে তেমন আগ্রহ নেই। যারা টাকা খুইয়েছেন, তাদের অধিকাংশই বসবাস করেন ভাসানটেকের ধামালকোট বস্তি, জাহাঙ্গীরের বস্তি, টিনশেড বস্তি, কাফরুলের বউবাজারসহ আশপাশের অন্তত ১০টি বস্তিতে।


জীবনের সব সঞ্চয় হারিয়ে পথে বসেছেন ভুক্তভোগীরা। প্রতারণার শিকার এসব মানুষের মধ্যে আছেন গার্মেন্টকর্মী, রিকশাচালক, দিনমজুর ও ফেরিওয়ালা। সংসারে মিতব্যয়ী হয়ে প্রতিদিন কিছু টাকা জমিয়ে বছর শেষে ১০ শতাংশ লাভসহ একসঙ্গে মোটা অঙ্কের টাকা পাওয়ার প্রত্যাশায় তারা অরবিট মাল্টিপারপাসে নাম লেখান। বছর শেষে টাকা পেয়ে কেউ মেয়ের বিয়ে দেওয়া, কেউ সন্তানের লেখাপড়ার খরচ, কেউ মাথা গোঁজার জন্য গ্রামের বাড়িতে একটি ঘর তোলার স্বপ্ন দেখছিলেন। তারা বুঝে উঠতে পারেননি, প্রতারক চক্র তাদের টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যাবে। ২০০৭ সাল থেকে ওই এলাকায় অরবিট মাল্টিপারপাস কার্যক্রম চালিয়ে আসছে এবং অনেককে ১০ শতাংশ লাভসহ মূল টাকা ফেরত দিয়েছে। এটি প্রতারক চক্রের প্রতারণার কৌশল। মানুষকে প্রথমে টাকা ফেরত দিয়ে আস্থা অর্জন করে আস্তে আস্তে সদস্য সংখ্যা বাড়াতে থাকে। এর সদস্য অন্তত তিন হাজার। তাদের সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত জমা হয়েছে। গড়ে প্রত্যেকের ৫০ হাজার টাকা জমা হলেও মোট টাকার পরিমাণ ১৫ কোটি। ওই টাকা নিয়ে ১০ নভেম্বর উত্তর কাফরুলের ১১/১/এ, ভবনের নিচতলায় অরবিট কো-অপারেটিভ সোসাইটির অফিস তালাবদ্ধ করে পালিয়েছে প্রতারক চক্র। প্রতারক চক্রের প্রধান মিজানুর রহমান ওরফে মিজান, তারিকুল ইসলাম ওরফে তারেক ও জালাল উদ্দিন। এ তিনজনসহ চক্রের সদস্য মান্নান, ফারুক, ভুট্টো ও আলমগীরের বিরুদ্ধে কয়েকজন ভুক্তভোগী কাফরুল ও ভাসানটেক থানায় কয়েকটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। অজ্ঞাত কারণে সেসব জিডির তদন্ত থমকে আছে। অরবিট ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মিজানুর রহমানের গ্রামের বাড়ি বরিশালের হিজলা উপজেলার টুমচরে। সম্পাদক তারিকুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের মজিদবাড়িয়ায়। পরিচালক জালাল উদ্দিনের বাড়ি বরগুনার বামনা উপজেলার উত্তর কাকচিড়া গ্রামে। তবে তারা ঢাকায় বসবাস করেন।


সমবায় অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে এই অধিদপ্তর থেকে অরবিট মাল্টিপারপাস নিবন্ধন নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে। উত্তর কাফরুলের ১১/১/এ, ভবনের নিচতলায় প্রতিষ্ঠানটির ভাড়া করা অফিস। গত শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, অফিস তালাবদ্ধ। শতাধিক ভুক্তভোগী সেখানে ভিড় করেছেন। জানা যায়, প্রায় প্রতিদিনই তাদের মতো শত শত ভুক্তভোগী ওই অফিসের সামনে এসে ঘুরে যান। পুরাতন কচুক্ষেতের গার্মেন্টকর্মী লাইলী জানান, তার ৩৩ হাজার টাকা জমা হয়েছে ওই প্রতিষ্ঠানে। উত্তর কাফরুলের গার্মেন্টকর্মী লিপি আক্তার লিপি পাবেন এক লাখ ৮৮ হাজার টাকা। বউবাজারের তানিয়ার জমা হয়েছে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে জানা যায়, অন্তত তিন হাজার মানুষের কাছ থেকে প্রতারক চক্র টাকা হাতিয়ে নিয়ে পালিয়েছে।


ভবন মালিক জাহেদা রহমান সমকালকে বলেন, ২০০৯ সালে মোস্তাফিজ নামের একজন তার কাছ থেকে নিচতলার একটি দোকানঘর ভাড়া নিয়ে অরবিট মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির অফিস করেন। কিছুদিন পর মোস্তাফিজ চলে যান। এর পর মিজান ও তারেক সেই অফিস চালাতেন। তারা প্রতিষ্ঠানটির মূল দায়িত্বে ছিলেন। পাঁচ মাসের ভাড়া বকেয়া রেখে ১০ নভেম্বর প্রতিষ্ঠান তালাবদ্ধ করে তারা পালিয়েছেন। তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তিনি যোগাযোগ করতে পারছেন না। তিনি জানান, ১০ নভেম্বরের পর টাকার দাবিতে প্রায় প্রতিদিন ওই অফিসের সামনে মানুষ জড়ো হচ্ছে। মিজান ও তারেক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানেন না তিনি। তারা অফিস ভাড়া নেওয়ার সময় তাদের কোনো বায়োডাটা বাড়ির মালিকের কাছে জমা দেননি।


অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ভাসানটেক ও কাফরুলের বস্তি এলাকার দরিদ্র মানুষকে সদস্য করতে মাঠে নামে। দিনমজুর, রিকশাচালক, গাড়িচালক, গার্মেন্টকর্মী, ফেরিওয়ালা, হকারসহ নিম্ন আয়ের মানুষকে তারা সদস্য করে। একজন ব্যক্তিকে একাধিক 'সঞ্চয় হিসাব' খোলার সুযোগও দেওয়া হয়। প্রতিদিন সঞ্চয় জমা নেওয়া হতো। তবে গার্মেন্টকর্মীরা সঞ্চয় জমা দিতেন প্রতি মাসে। প্রতিষ্ঠানটির মাঠ পর্যায়ে টাকা ওঠানোর জন্য অন্তত ১০ জন কর্মচারী ছিল। সদস্যদের কাছ থেকে ওঠানো টাকা দিয়ে গাজীপুরে জমি কেনা হয় বলে জানানো হতো।


ভাসানটেক ২৮ নম্বর ধামালকোট বস্তির বাসিন্দা গাড়িচালক নজরুল ইসলাম জানান, ওই বস্তিতে অন্তত ২০০ জন অরবিট মাল্টিপারপাসের সদস্য। তার স্ত্রী রুমা প্রতিদিন ১৫০ টাকা জমা দিতেন। তার প্রায় ৫০ হাজার টাকা জমা হয়েছে। লভ্যাংশসহ ডিসেম্বরে সেই টাকা ফেরত দেওয়ার কথা ছিল।


একই বস্তির বাসিন্দা বৃদ্ধ রেহেনা মেয়ে রীতার বিয়ের জন্য ওই প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন টাকা জমা দিতেন। তিনি জানান, তিনিসহ তার দুই ছেলে ও মেয়ের নামে পাঁচটি 'সঞ্চয় হিসাব' ছিল। মেয়ে গার্মেন্টে চাকরি করেন আর দুই ছেলে মুদিদোকানি। প্রায় এক লাখ টাকা তাদের জমা হয়েছে। নভেম্বরের শুরুতে ১০ শতাংশ লাভসহ টাকা ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু টাকা না দিয়ে তাদের ঘোরাতে থাকে। রেহানা বলেন, 'টাকা নিয়ে ওরা পালিয়ে যাওয়ায় আমি পথে বসেছি। মেয়ের বিয়ের টাকা জোগাড় করব কীভাবে?' নিলুফা আক্তার নামের এক নারী ওই বস্তির টাকা ওঠাতেন বলে জানান তিনি। ওই বস্তির গোলাম হোসেনের পাওনা এক লাখ ৭৩ হাজার টাকা। লাকী বেগম জানান, তিনি জমা দিয়েছেন দুই লাখ দুই হাজার টাকা। একই বস্তির মনির হোসেন জানান, তার স্ত্রী খালেদা ও ছেলে রাজীবের নামে ৯০ হাজার টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। মিজান ও তারেকসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে তিনি ১৫ নভেম্বর ভাসানটেক থানায় জিডি করেন। সেই জিডির তদন্তে নামেনির্ পুিলশ। তদন্তের দায়িত্বে থাকা ভাসানটেক থানার এসআই রবিউল ইসলাম শুক্রবার বলেন, তিনি খুব শিগগির তদন্ত শুরু করবেন।


উত্তর কাফরুলের খাদিজা আক্তার মিতা অরবিট মাল্টিপারপাসের মিজান, তারেক, মান্নান, ফারুক, জালাল, ভুট্টো ও আলমগীরের বিরুদ্ধে ১৬ নভেম্বর কাফরুল থানায় জিডি করেন। তাতে বলা হয়, তিনি ৭০ হাজার টাকা জমা দিয়েছেন ওই প্রতিষ্ঠানে। অভিযুক্তদের মোবাইল ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না। একই দিন একই থানায় আরেকটি জিডি করেন উত্তর কাফরুলের বাসিন্দা নাছিমা। তার এক লাখ টাকা নিয়ে পালিয়েছে প্রতারক চক্রের সদস্যরা। কাফরুল থানার এসআই কামরুল হোসেন শুক্রবার সমকালকে বলেন, তিনি এখনও তদন্ত শুরু করেননি। তানিয়া নামের এক ভুক্তভোগী জানান, তিনিও কাফরুল থানায় জিডি করেছেন। তিনি বলেন, সমিতিতে টাকা হারিয়েছি, আবার জিডি করতেও ৩০০ টাকা দিতে হয়েছে।


সমবায় অধিদপ্তরের মিরপুর থানা এলাকার কর্মকর্তা রুহুল আমিন  বলেন, আমানত সংগ্রহের নামে অরবিট শত শত গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। অরবিটের সভাপতি মিজানুর রহমান সমিতির সদস্যদের টাকায় নিজের নামে গাজীপুরে প্রায় ২০ শতাংশ জমি কিনেছেন। মিজানুর যাতে গাজীপুরের জমি বিক্রি করতে না পারেন, সে জন্য গত ১৫ নভেম্বর গাজীপুরের সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে জানানো হয়েছে।

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.