ময়লা-আবর্জনা, কচুরিপানার মধ্য দিয়ে মাসখানেক আগেও মৃদু স্রোত বয়ে যেত খালটিতে।


 আশপাশের পানিও সেখান দিয়েই নিষ্কাশিত হতো। বিগত ঈদুল আজহার আগের রাতেই বদলে যায় চেহারা। বালু-মাটি দিয়ে রাতারাতি খালটি ভরাট করে ফেলা হয়। ৩০ ফুট প্রশস্ত খালের মাত্র ফুটখানেক এখন অবশিষ্ট আছে। সম্প্রতি খালটি উদ্ধার করতে গিয়ে প্রতিরোধের মুখে পড়ে ফিরে এসেছে ঢাকা ওয়াসার একটি দল। এখন ভরাট করে টিনের বেড়া দিয়ে সেখানে গড়ে তোলা হচ্ছে বহুতল শপিং কমপ্লেক্স। রাত-দিন চলছে পাইলিংয়ের কাজ। রবি ও সোমবার সরেজমিনে চোখে পড়েছে এমন চিত্র।




দেখা যায়, আগারগাঁও-শ্যামলী লিংক রোডের বাংলাদেশ বেতারের পাশ দিয়ে মিরপুরের দিকে চলে গেছে ৬০ ফুট প্রশস্ত সড়ক। এ সড়ক ধরে তিনশ' ফুট এগোলেই তিতাস গ্যাসের প্রধান কার্যালয়ের নবনির্মিত বহুতল ভবন। এর আগেই রাস্তার পশ্চিম পাশ দিয়ে চলে গেছে খালটি। কিছু দূর এগিয়ে বাঁয়ে বাঁক নিয়ে খালটি অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। সেখানে একপাশে তৈরি হচ্ছে ১৭ তলাবিশিষ্ট মমতা বহুমুখী

সমবায় সমিতি শপিং কমপ্লেক্স। এটার চারপাশ টিন দিয়ে ঘেরা। এর উত্তর পাশে দেয়াল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে একটি প্লট। ভেতরে বাঁশের খুঁটিতে সাঁটানো 'স্টাইল রিয়েল এস্টেট' নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ফ্ল্যাট বিক্রির বিজ্ঞাপন। দুই দেয়ালের মাঝখানে খালের অস্তিত্ব এক ফুটের বেশি নয়। অথচ ঢাকা ওয়াসায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানে খালের প্রশস্ততা ৩০ ফুট থাকার কথা। স্থানীয়রা জানান, মমতা বহুমুখী সমবায় সমিতির শপিং কমপ্লেক্সের জন্য খালটি ভরাট করা হয়েছে। আর এটা করেছে সমবায় সমিতির লোকজন।

মমতা বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাজী বেলায়েত হোসেন নকশায় ৩০ ফুট খাল থাকার কথা স্বীকার করেন। তবে তারা কোনো খাল ভরাট বা দখল করেননি বলে দাবি করেন। ১৯৯৬ সালের দিকে তারা পূর্ত বিভাগ থেকে এক একর জমি বরাদ্দ নেন। এরও ২০ শতাংশ ছেড়ে তারা মার্কেটের নকশা করেছেন। তিনি সমকালকে বলেন, খাল দখলের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। দখল করেছে তাদের বিপরীত পাশের প্লটের মালিক।

বিপরীত পাশের ওই প্লটের মালিকের সন্ধানে গিয়েও পাওয়া যায়নি। তবে মালিকের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে শওকত নামের একজন জানান, তাদের যেটুকু জমি সেটাই মাপজোখ দিয়ে দেয়াল তুলেছেন। তাহলে খাল গেল কোথায়_ সে প্রশ্নের উত্তরে বলেন, মমতা বহুমুখী সমবায় সমিতির বাউন্ডারির মধ্যেই খাল পড়েছে। ওরাই খালের জমি ভরাট করে দখল করেছে।

এ প্রসঙ্গে বিএনপি বস্তি মার্কেটে অবস্থিত মমতা বহুমুখী সমবায় সমিতির কার্যালয়ে গিয়ে সভাপতি হাজি আবু তাহেরের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানান, বিষয়টি পূর্ত বিভাগই বলতে পারবে। তিনি পূর্ত বিভাগে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

এ বিষয়ে পূর্ত বিভাগের ওই এলাকার দায়িত্ব পালনকারী শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আতাউর রহমানও ৩০ ফুট খালের কথা স্বীকার করেন। তিনি জানান, খালের কিছু জমি মমতা বহুমুখী সমবায় সমিতি শপিং কমপ্লেক্সের ভেতরে পড়েছে। সেটা ১০ ফুট হতে পারে। এটা ছেড়ে দেওয়া কোনো ব্যাপার নয়। ওই স্থানের বস্তিগুলো উচ্ছেদ করার জন্যই এটা করা হয়েছে। ওয়াসা খাল খনন করতে চাইলে খালের জমি ছেড়ে দেওয়া হবে। খালটি বেঁচে থাক, এটা তিনিও চান। কারণ খাল রক্ষার ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনা রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

পূর্ত বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি সিদ্ধান্তে মমতা বহুমুখী সমবায় সমিতিকে ৭৭ দশমিক ৩ শতাংশ জমি বরাদ্দ দেওয়া হয় মার্কেট নির্মাণের জন্য। এরই মধ্যে সমবায় সমিতির পক্ষ থেকে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে দোকান বরাদ্দ নিতে বিপুল অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর আগারগাঁও এলাকায় স্থানান্তরের কারণে ওখানে মার্কেট তৈরির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অবশ্য এ ব্যাপারে নির্বাহী প্রকৌশলী আতাউর রহমান বলেন, মার্কেট করা না করার ব্যাপারে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। বিএনপি বস্তি উচ্ছেদ ও স্থানীয় দোকানিদের পুনর্বাসনের জন্য সরকার জায়গাটি বরাদ্দ দিয়েছিল।

স্থানীয়রা আরও জানান, খালটি একসময় হারিয়ে যেতে বসেছিল। কয়েক বছর আগে ঢাকা ওয়াসা বিপুল অর্থ ব্যয় করে খালটি খনন করে। কল্যাণপুর থেকে শ্যামলী-২ নম্বর রোড পর্যন্ত খালের দু'পাড় বাঁধাইও করা হয়। মাস দুয়েক আগে ওয়াসা খালটির আবর্জনা পরিষ্কার ও খনন করতে গেলে কিছু লোক বাধা দেয়। এর পর ওয়াসা সেদিকে নজর দেয়নি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, খাল ভরাটকারী ও দখলদারদের মধ্যে ঢাকা ওয়াসা ও পূর্ত বিভাগের একটি গোপন বোঝাপড়া আছে। যে কারণে এ দুটি সংস্থা নীরব রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা অ্যাডভোকেট জাহিদ বলেন, আমরা খালটি রক্ষার চেষ্টা করেছিলাম; কিন্তু ভরাটকারীরা এতই প্রভাবশালী যে, কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাইছেন না। ফলে এখন পুরোটাই দখলে নিয়ে ভরাট করা হয়েছে। এতে পানি যাওয়ার কোনো উপায় থাকল না। ভারি বৃষ্টি হলেই পুরো মহল্লা পানিতে তলিয়ে যাবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, খাল ভরাট করে সীমানাপ্রাচীর দেওয়া ওই জায়গায় ক্রেন দিয়ে একেকটি বড় বড় পিলার পাইলিংয়ের মেশিনে দেওয়া হচ্ছে। পাশেই দেখা যায়, সীমানানির্দেশকের মতো কয়েকটি ছোট খুঁটি। স্থানীয়রা জানান, সমিতির বরাদ্দ নেওয়া জমির সীমানা ওই খুঁটি পর্যন্ত। এরপর বাকিটা খালের জায়গা। কিন্তু দেখা যায়, সেই খুঁটি থেকে আরও অন্তত ২০ ফুট সরে টিনের বেড়া দিয়ে নির্মাণকাজ চলছে। নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত একজন জানান, ৫৩ কোটি টাকায় তারা শপিং কমপ্লেক্সের চারতলা পর্যন্ত নির্মাণ করে দেবেন। পুরো ভবনটি হবে ১৭ তলা। নিচে থাকবে গাড়ি পার্কিংয়ের দুটি বেজমেন্ট। চারতলা পর্যন্ত হবে মার্কেট। ওপরে থাকবে ব্যাংক-বীমা বা অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান।

রাজধানীর খাল দেখভালের দায়িত্ব পালনকারী ঢাকা ওয়াসার ড্রেনেজ সার্কেলের প্রকল্প পরিচালক ক্যা সা সিং বলেন, ৭০০ মিটার দৈর্ঘ্যের ওই খালটির ৩০০ মিটার পর্যন্ত পাড় বাঁধাই করা হয়েছে। বাকি অংশও বাঁধাই করে খালটি রক্ষা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে মমতা বহুমুখী সমবায় সমিতির শপিং কমপ্লেক্সের পাশে খালের ওই জায়গা নিয়ে ওয়াসার সঙ্গে তাদের মামলা চলছে। আদালত ওই পয়েন্টের কিছু জায়গার ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেছেন। এতে খালটির অবস্থা স্বাভাবিক থাকার কথা; কিন্তু মমতা হাউজিং হয়তো ভরাট করে সেখানে প্রাচীর দিয়েছে। মামলার কারণে আপাতত কোনো পদক্ষেপ ওয়াসা নিতে পারছে না।

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.