ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক তরুণী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। গতকাল বুধবার এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে হাসপাতালে দায়িত্বরত আনসারের ছয় সদস্যকে চাকরিচ্যুত এবং তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া রংপুর শহরের সর্দারপাড়ায় নার্সিং ইনস্টিটিউটের দুই ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হন। এ ঘটনায় ওই নার্সিং ইনস্টিটিউটের এক ছাত্রকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।


ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছেই অথচ ধর্ষকদের শাস্তি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না


গত ২৯ অক্টোবর ঢাকা মেডিকেলে, এর দুই দিন আগে ২৭ অক্টোবর রংপুরে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। শুধু ঢাকা মেডিকেল ও রংপুরই নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। সুষ্ঠু বিচার ও ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনেরা।


গতকাল রাতে যোগাযোগ করা হলে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, সম্প্রতি ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে। ধর্ষকদের শাস্তি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। অপরাধীরা সহজে পার পেয়ে যাচ্ছে। প্রভাবশালীদের দিয়ে পুলিশকে ম্যানেজ করে দুর্বল অভিযোগপত্র দেওয়া বা অভিযোগপত্র থেকে অপরাধীদের বাদ দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। প্রশাসনযন্ত্রের ব্যর্থতাসহ সব মিলিয়ে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে।


বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে সারা দেশে বিভিন্ন বয়সের ৪৬৬ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, অর্থাৎ প্রতি মাসে ধর্ষণের শিকার গড়ে প্রায় ৫২ জন। এসব ঘটনায় ২৫০টি মামলা হয়েছে। গত নয় মাসে সারা দেশে ধর্ষণের চেষ্টা ও ধর্ষণের পর ২৬ জনকে হত্যা করা হয়েছে। 


বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবরে সারা দেশে ১১৫ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ৪ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ সময় ২৪ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা ও ১৬ জন বিভিন্ন বয়সের নারী ও শিশুর শ্লীলতাহানি করা হয়। ১৪টি দৈনিকের প্রকাশিত খবর অনুযায়ী মহিলা পরিষদ এই পরিসংখ্যান তৈরি করেছে বলে জানিয়েছে।


এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল গতকাল বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থায় ধর্ষকেরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের সুষ্ঠু বিচার ও শাস্তি হয় না। তাদের জবাবদিহিও করতে হয় না। তাদের মধ্যে ভয় কাজ না করায় ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে।


গত ২৯ অক্টোবর রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগের ক্যানসার বিভাগের একটি কক্ষে ২০ বছরের এক তরুণীকে ধর্ষণ করার অভিযোগ ওঠে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত আনসারের ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় চাকরিচ্যুত আনসারের ছয় সদস্য হলেন সহকারী প্লাটুন কমান্ডার একরামুল, আনসারের সদস্য আমিনুল ইসলাম, আতিকুল ইসলাম, মীর সিরাজ, মিনহাজ ও বাবুল মিয়া। গতকাল সন্ধ্যায় নির্যাতিতা তরুণী ওই ছয়জনের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা করেন। এরপর পুলিশ আনসারের সদস্য আতিকুলকে গ্রেপ্তার করে।


ঢাকা জেলা আনসারের কমান্ড্যান্ট সাইফুল্লাহ রাসেল গতকাল সন্ধ্যায়  বলেন, অভিযোগ ওঠায় আনসারের ছয় সদস্যকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। ওই আনসার সদস্যদের তিন বছরের চুক্তি ইতিমধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের সঙ্গে নতুন চুক্তি নবায়ন না করে তাঁদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তও শুরু হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যাবে।


বর্তমানে তরুণীটি হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) চিকিৎসাধীন। ওসিসির সমন্বয়কারী বিলকিস বেগম গতকাল বলেন, ওই তরুণী গত বৃহস্পতিবার রাতে হাসপাতালের গাইনি বিভাগে ভর্তি হন। পরের দিন তাঁকে ওসিসিতে স্থানান্তর করা হয়। তরুণীটি আনসারের ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ করেছেন। ওসিসিতে ভর্তির পরপরই তরুণীটির ফরেনসিক ও কাউন্সেলিং পরীক্ষা করানো হয়েছে। এতে ধর্ষণের আলামত মিলেছে। পরীক্ষায় ধরা পড়েছে, মেয়েটির মানসিক সমস্যা আছে। তিনি কখনো সুস্থ থাকেন, আবার কখনো অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তরুণীটির ভাইকে ফোন করে খবর দিয়ে হাসপাতালে আনা হয়।


ওসিসি সূত্রে জানা গেছে, গত মাসে নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার সর্বোচ্চ ৮১ জন নারী ও শিশু ওসিসিতে ভর্তি হয়। অন্য সময় মাসে এ সংখ্যা ৫০ থেকে ৫৬ থাকে। গত মাসে ধর্ষণের শিকার আড়াই বছরের এক শিশুসহ ২৫টি শিশু ভর্তি হয়। গতকাল ওসিসিতে থাকা ১১টির মধ্যে ৭টি শিশুই ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার।


ওই তরুণীর সঙ্গে কার কী ঘটেছে, তা তদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে বলে জানান ওসিসির সমন্বয়কারী বিলকিস বেগম। গতকাল হাসপাতালে তরুণীটির ভাই  বলেন, তাঁদের বাড়ি কুমিল্লায়। তাঁর বোন কুমিল্লায় থাকতেন আর তিনি ঢাকায় থাকেন। পাঁচ-ছয় দিন আগে তাঁর বোন কুমিল্লার বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে যান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ফোন পেয়ে তিনি হাসপাতালে গিয়ে ঘটনা জানতে পারেন।


তরুণীর ভাই জানান, তাঁর বোন পড়াশোনায় ভালো ছিলেন। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়েছেন। ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত তাঁর বোনের রোল নম্বর ১ ছিল। ওই সময় বাবার মৃত্যুর পর সপ্তম শ্রেণিতে ওঠার সময় বোনের রোল নম্বর হয় ৩, নবম শ্রেণি পর্যন্ত এই রোল নম্বরই থাকে। বাবার মৃত্যুশোক, ক্লাসে পিছিয়ে পড়া নিয়ে অন্যদের ব্যঙ্গ, সাইনাস-মাইগ্রেনের সমস্যা সব মিলিয়ে বোনের কিছুটা মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। বোন কখনো ভালো থাকেন, আবার কখনো অসুস্থ হয়ে পড়েন।


ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক খাজা আবদুল গফুর সাংবাদিকদের বলেন, অভিযোগ ওঠা আনসারের ছয় সদস্যকে আনসার কর্তৃপক্ষ গতকাল প্রত্যাহার করেছে। এ ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আলোচনা করে পদক্ষেপ নেবে।

এদিকে গত ২৭ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পূর্ব দিকের ফটকের একটু দূরে বেসরকারি একটি নার্সিং ইনস্টিটিউটের দুই ছাত্রী নোট নিতে প্রতিষ্ঠানের পাশে সর্দারপাড়ায় একটি মেসে এক সহপাঠীর কাছে যান। মেসটির বাসিন্দা ওই প্রতিষ্ঠানের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আলমগীর কবির তাঁদের বাসার ভেতরে নিয়ে বসান। এরপর আলমগীর বাইরে গিয়ে স্থানীয় চার যুবককে নিয়ে আসেন। তাঁরা পাঁচজনে মিলে ওই দুই ছাত্রীকে ধর্ষণ করেন।


পুলিশ জানায়, ধর্ষণের শিকার দুই ছাত্রীকে কোতোয়ালি থানার ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে রাখা হয়েছে। গতকাল দুপুরে রংপুর মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে তাঁদের ডাক্তারি পরীক্ষা করানো হয়েছে। তবে এখনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।


রংপুরের কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ বি এম জাহিদুল ইসলাম  বলেন, ঘটনার পাঁচ দিন পর গত মঙ্গলবার রাতে দুই ছাত্রীর একজন কোতোয়ালি থানায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলা হওয়ার পর নার্সিং ইনস্টিটিউটের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আলমগীর কবিরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গতকাল আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। পরে জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম তাঁর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এজাহারভুক্ত অন্যরা আসামিরা পলাতক।


মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ধর্ষণের আগে ওই পাঁচজন দুই ছাত্রীকে বিবস্ত্র করে মুঠোফোনে ছবি ধারণ করেন এবং তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ারও হুমকি দেন। জানাজানি হওয়ার ভয়ে ওই দুই ছাত্রী প্রথমে বিষয়টি গোপন রাখেন। পরে অভিভাবকদের জানান এবং এক ছাত্রী পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেন।


গত ১৮ অক্টোবর দিনাজপুরের বাড়ি থেকে পাঁচ বছর বয়সী ওই শিশু নিখোঁজ হয়। পরদিন ভোরে শিশুটিকে তার বাড়ির কাছে হলুদখেতে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় পাওয়া যায়। সেখানে তাকে ধর্ষণ করা হয়। তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতাল, পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় সেখান থেকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে রাখা হয়েছে।



Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.