পানির অভাবে তিস্তাপারের পাঁচ জেলার কৃষি ও পরিবেশে বিপদ বাড়ছে। এই পাঁচ জেলা হলো রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও লালমনিরহাট। উজান থেকে পানি না পাওয়ায় ওই এলাকার কৃষিকাজে প্রয়োজনীয় পানির ৯৮ শতাংশই মেটানো হচ্ছে ভূগর্ভ থেকে তুলে। ফলে সেচের চাহিদার মাত্র দেড় শতাংশ সরবরাহ করতে পারছে তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প।


পানির অভাবে বিপন্ন তিস্তাপারের কৃষিকাজ


খাদ্যনিরাপত্তা-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইফপ্রি ও বাংলাদেশি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর এগ্রি রিসার্চ অ্যান্ড সাসটেনেবল এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ডেভেলপমেন্ট, কাসিডের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের এগ্রিকালচারাল পলিসি ইউনিট গবেষণাটি করিয়েছে।


ইন্টিগ্রেটেড এগ্রিকালচারাল স্ট্র্যাটেজিক্যাল প্ল্যান ফর তিস্তা বেসিন রিজিওন ইন বাংলাদেশ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে তিস্তা ও তার প্রবাহ এলাকায় ৮৫ হাজার ৫৭০ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। কিন্তু তার মধ্যে এখন বছরে মাত্র ১ হাজার ২২০ টন মাছ আসে তিস্তা এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত ২০টি নদী থেকে। অথচ ১৯৮৪-৮৫ সালে তিস্তার উজানে যখন বাঁধ দেওয়া হয়নি, তখন তিস্তা এবং তার প্রবাহ এলাকার নদীগুলো থেকে মাছ পাওয়া যেত ৮ হাজার টন। গত দুই যুগ আগে এই এলাকার নদীতে পাওয়া যেত—এমন হরেক র​কমের মাছের চিরতরে হারিয়ে গেছে।


এ ছাড়া পানি ও নদীর সঙ্গে বয়ে আসা পলির অভাবে তিস্তা এলাকার মাটির ব্যাপক গুণগত অবক্ষয় হয়েছে। কৃষিকাজ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে মাটিতে সাধারণত আড়াই শতাংশ জৈব উপাদান থাকতে হয়। তিস্তা এলাকায় মাটির জৈব উপাদান গড়ে ১ শতাংশে নেমে এসেছে। পানির অভাবে বিস্তীর্ণ এলাকা বালুময় ও ধূসর হয়ে উঠছে। দেশের মোট ভূমির ১৩ শতাংশ বনভূমি হলেও তিস্তা এলাকায় বনভূমির পরিমাণ ১ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।


মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব জহুরুল করিমের নেতৃত্বে ওই গবেষণায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের ওপরে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞদের পাঁচ সদস্যের একটি দল কাজ করেছে। প্রতিবেদনে সরকারকে ভারতের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত তিস্তা চুক্তি করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।


এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, সরকার তিস্তা চুক্তি দ্রুত সম্পাদনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। তাঁরা আশা করছেন, খুব দ্রুত চুক্তি হবে এবং উজান থেকে পানির প্রবাহ বাড়বে।


গবেষণা প্রসঙ্গে জহুরুল করিম বলেন, তিস্তা এলাকার ৭৮ শতাংশ জমি কৃষিকাজের উপযোগী। কিন্তু পানির অভাবে ওই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। দীর্ঘ দুই যুগ ধরে পানি না আসায় ওই এলাকার পরিবেশব্যবস্থায় বড় ধরনের বদল হয়ে গেছে। ফলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ওই এলাকায় কী ধরনের কৃষিকাজ করতে হবে, তার একটি দিকনির্দেশনাও তাঁরা তৈরি করেছেন। তবে তা বাস্তবায়ন করতে হলে তিস্তায় পানি দরকার।


ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার অ্যাসোসিয়েশনের ‘ওয়াটার পলিসি জার্নাল ২০১৬’ সংখ্যায় প্রকাশিত ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিস্তার পানি কমে যাওয়ায় ২০০৬-০৭ থেকে ২০১২-১৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ৪৫ লাখ টন ধান উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ৮০০ কোটি টাকার ওপরে। ২০১৬ সাল পর্যন্ত হিসাব ধরলে ধানের পরিমাণ ৬০ লাখ টন এবং আর্থিক মূল্য ১ হাজার কোটি টাকা ছাড়াবে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।


বাংলাদেশ পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ ও আরফানুজ্জামান যৌথভাবে ওই গবেষণা করেছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটিতে দেখানো হয়েছে, ২০০৬-০৭ সালে তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প ১৮ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে সেচের পানি সরবরাহ করার লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছিল। কিন্তু তারা এর মাত্র ১৪ শতাংশ পূরণ করতে পেরেছে। ২০১৩-১৪ সালে ৭০ হাজার হেক্টর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে মাত্র ৩৫ শতাংশ পূরণ করতে পেরেছে।


এই গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, গত এক যুগের মধ্যে পাঁচ বছর শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় কার্যত পানিই ছিল না। ভারত থেকে যতটুকু পানি পাওয়া যায়, তা কার্যত তিস্তা ব্যারাজের মাধ্যমে সেচ নালায় সরবরাহ করা হয়। ফলে ব্যারাজের পর ডালিয়া পয়েন্ট থেকে ৯৭ কিলোমিটার পর্যন্ত তিস্তায় কার্যত কোনো পানি থাকে না। এতে পুরো এলাকা বালুময় হয়ে উঠছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর এলাকায় আগে মাটির ৩০ থেকে ৩৫ ফুট নিচে পানি পাওয়া যেত। এখন ৬০ থেকে ৬৫ ফুট নিচেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, দুই যুগ আগেও তিস্তা এলাকার ৮০ শতাংশে আমন ধানের চাষ হতো, যে কারণে তিস্তা ব্যারাজ তৈরি করা হয়েছিল আমন চাষে সেচ দেওয়ার জন্য।


এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ৪০ বছর ধরে তিস্তা নদী দিয়ে ভাটির দেশ বাংলাদেশে কী পরিমাণে পানি এসেছে, তার একটি গড় হিসাব করতে হবে। মোট প্রবাহের অর্ধেক পানি যাতে বাংলাদেশে আসে, সেটা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। শুষ্ক মৌসুমে কমপক্ষে পাঁচ হাজার কিউসেক পানি তিস্তা দিয়ে বাংলাদেশে এলে ওই এলাকার কৃষির পুরো সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাবে।


এদিকে ইফপ্রি ও কাসিডের গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৯৭ সালে তিস্তা নদীর উজান থেকে পানি এসেছিল ৬ হাজার ৫০০ কিউসেক। ধারাবাহিকভাবে ওই পানির প্রবাহ কমতে কমতে গত বছর তা ২৫০ কিউসেকে নেমে এসেছে। উজান থেকে পানি কমে যাওয়ায় তিস্তাপারের পাঁচ জেলার মাটির পানিতে জৈব উপাদান কমে বালুর পরিমাণ বাড়ছে। ফলে পুরো এলাকায় পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।


কিন্তু তিস্তায় পানি সরবরাহ কমে আসায় স্থানীয় কৃষকেরা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল বোরো ধানের দিকে ঝুঁকেছেন। বর্তমানে তিস্তা এলাকার ৫৬ শতাংশ জমিতে বোরো এবং ৪৪ শতাংশ জমিতে আমন ও আউশ ধানের চাষ হয়। বোরো মৌসুমে ভুট্টা ও সবজি চাষের প্রবণতা বাড়ছে।


নদী শুকিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় জেলেরাও সমস্যায় পড়েছেন। তবে নদীর মাছ কমলেও তিস্তা এলাকায় পুকুরে মাছ চাষ বাড়ছে। আর এসব পুকুরের জন্য ভূগর্ভের পানি তোলা হচ্ছে। ফলে পুরো এলাকায় ভূগর্ভের পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে যাচ্ছে। ১৯৮৪-৮৫ সালে পুকুর থেকে আসত মাত্র ৩ হাজার টন মাছ। ২০১৩-১৪ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৫২ হাজার টন।


বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের ফেলো আবু সৈয়দ তিস্তার পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে ছয় বছর ধরে গবেষণা করছেন। তিনি দেখেছেন, তিস্তা নদী নিয়ে অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনাতেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব। ভারত ও বাংলাদেশ মিলে অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুললে দুই দেশই লাভবান হবে।


Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.