আগামী বছরের মাঝামাঝিতেই জাতীয় নির্বাচন করার কথা ভাবছে ক্ষমতাসীন আ’লীগ। সরকারের পক্ষ থেকে যেকোন সময় নির্বাচনের ঘোষণা আসতে পারে।


 সম্প্রতি দলটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে প্রভাবশালী একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীর একান্ত বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় বলে জানা গেছে। এছাড়া সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীসহ আ’লীগ নেতাদের বক্তব্যেও বারবার জাতীয় নির্বাচনের কথা উঠে আসছে। গত জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতাদের নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার কথা বলেছেন। গতকাল দলটির প্রভাবশালী নীতি নির্ধারক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আ’লীগের সম্মেলন থেকেই জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হবে। অপর নেতা মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে আসতেই হবে। সব মিলিয়ে বিরোধী পক্ষকে অন্ধকারে রেখে যেকোন সময় জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা আসতে পারে বলে জানা গেছে। 

ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত পিয়রে মায়াদু সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে ডিকাব টক অনুষ্ঠানে বলেন, বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশ-ইইউ যৌথ কমিশনের বৈঠকে আলোচনা হবে। ২০ ডিসেম্বর ব্রাসেলসে বাংলাদেশ-ইইউ যৌথ কমিশনের গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানবাধিকার-বিষয়ক উপকমিটির বৈঠকের আলোচনায় বিষয়টি আসবে। ইইউর রাষ্ট্রদূত বলেন, নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে যেহেতু ইইউ যুক্ত ছিল, খুব সংগত কারণেই ব্রাসেলসের বৈঠকের আলোচ্যসূচির শীর্ষে থাকবে বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের প্রসঙ্গটি। বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচন ২০১৯ সালে হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এ সময়টা খুব দূরে নয়। নির্বাচন নিয়ে জনগণের আস্থা ফেরাতে ইসি গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দেন তিনি।

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়-সংলগ্ন একটি কমিউনিটি সেন্টারে শেখ রাসেলের জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন থেকে আগামী জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করার জন্য দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন থেকে শুরু হবে আগামী জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করার জন্য নতুন যারা নির্বাচিত হবেন তাদের তৃণমূল নেতাদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে।

সূত্র মতে, চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি রাজধানীতে অনুষ্ঠিত বিএনপি ও ক্ষমতাসীন আ’লীগের পৃথক জনসভা থেকেই বুঝা গেছে জাতীয় নির্বাচনের দিকেই এগুচ্ছে দেশ। গত সাত বছর ধরে দলের নেতাকর্মীদের উপর অব্যাহত হামলা-মামলা সত্ত্বেও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া শান্তি ও সমঝোতার পক্ষেই কথা বলেছেন। অন্যদিকে আ’লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও একই ধরনের বক্তব্য রেখেছেন। বিদেশীরাও চায় না বাংলাদেশে আর কোন (ভায়োলেন্স) সহিংসতা হউক। সার্বিক আলোচনা থেকে দেশবাসীসহ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পর্দার অন্তরালে ২০১৭ সালেই জাতীয় নির্বাচনের বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে তার আগে আ’লীগ সর্বস্তরে তাদের গ্রাউন্ড তেরি করতে চায়। যা এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সরকার ২০ দলীয় জোট থেকে নির্বাচিত অধিকাংশ জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে চাপে রেখেছে। আদালতে হাজিরা নিয়েই ব্যস্ত। প্রথম দুই ধাপ বাদ দিয়ে পরের সব ক’টি উপজেলা নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা একচেটিয়া দখলে নিয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন সিটি নির্বাচনে নজিরবিহীন ভোট ডাকাতির মাধ্যমে বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে। পৌরসভা নির্বাচনেও তারা দখলে নিয়েছে।

 সর্বশেষ নজিরবিহীন ভোট ডাকাতির মাধ্যমে ইউপি নির্বাচনে নিজেদের দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ী করেছে আ’লীগ। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে তাদের আধিপত্য বজায় রাখার পাশাপাশি সর্বস্তরে দলীয়করণের পরই হঠাৎ করে প্রধানমন্ত্রী দলের নেতাকর্মীদের নির্বাচনের প্রস্ততি নিতে বললেন। গত ২৬ জুলাই হঠাৎ করেই দলীয় নেতাদের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। এখন সরকারের পক্ষ থেকে শুধু ঘোষণার অপেক্ষা। 

সূত্র মতে, সবার অংশগ্রহণে দ্রুত নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছিল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর থেকেই কারো কাছেই সেই নির্বাচন বৈধতা পায়নি। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল সেটি নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। প্রশ্নবিদ্ধ সেই নির্বাচনের প্রায় তিন বছর পর এখন ক্ষমতাসীনরা নতুন করে নির্বাচনের কথা ভাবছে। যদিও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা চলমান সংকট নিরসনে আলোচনার মাধ্যমে সবদলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছেন। আন্তর্জাতিক মহলও দেশের চলমান সংকট নিরসনে সংলাপের পাশাপাশি অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের কথাই পুনর্ব্যক্ত করেছে। 

সূত্র মতে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও সব দলের অংশগগ্রহণ নিশ্চিতের লক্ষ্যে এখনই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী পদ্ধতি (ম্যাকানিজম) বের করার তাগিদ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মহল। তারা বলছেন, আগামী সবগুলো নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হতে হবে এবং এসব নির্বাচনে জনগণের আস্থা থাকতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা করে সরকারকেই এ পন্থা বের করার জন্য তাগিদ দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবি ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে বার বার নাকচ করা হলেও এসব ইস্যুতে এখনই আলোচনা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। 

সূত্র মতে, সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকে ঢাকায় সফররত ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)- এর প্রতিনিধিদলের সদস্যরা বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানোর আগে অবশ্যই দেশে একটি জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এসময় দেশের গণতান্ত্রিক এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধিদল। কোনো অগণতান্ত্রিক সরকারকে পৃষ্ঠপোষকতা করলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের জনগণের কাছে জবাবদিহিতা করতে হয়। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশে এমন একটি সরকার ও সংসদ দেখতে চায় যেখানে সংসদ সদস্যরা হবেন জনগণের ভোটে নির্বাচিত এবং নির্বাচনটা হবে সবদলের অংশগ্রহণে।

রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা ব্লুম বার্নিকাট বলেছেন, গণতান্ত্রিক ইতিহাস, সহিষ্ণুতা, উদারতা এবং শান্তিপূর্ণ ধর্ম পালনের ঐতিহ্যই বাংলাদেশে সন্ত্রাস প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা। একই সঙ্গে তিনি গঠনমূলক রাজনৈতিক সংলাপ, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং গতিশীল নাগরিক সমাজের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেছেন। একটি ভারসাম্যপূর্ণ গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক বিতর্কেরও তাগিদ দিয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, আবারো ক্ষমতায় থাকতে সর্বস্তরে গ্রাউন্ড তেরি করেই আ’লীগ প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের নেতাকর্মীদের নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, সরকার ক্ষমতায় থাকতে সর্বস্তরে দলীয়করণ করেছে। সিটি মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র, ইউনিয়ন পরিষদ এখন সরকারি দলের দখলে। বিএনপির সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলায় সাজা দেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অর্থ পাচার মামলায় সাজা দেয়া হয়েছে। এখন রায়ের অপেক্ষায় রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াও। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। বিএনপির একাধিক নেতা বলেন, সরকার বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ সিনিয়র নেতাদের মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে পারে। কিন্তু দশম সংসদ নির্বাচনের মতো আবার সাজানো নির্বাচন করতে চাইলে দেশের পরিস্থিতি আবারো নাজুক হয়ে পড়বে। তবে বিরোধী নেতাদের সাজা দেয়ার পাশাপাশি নির্বাচনকালীন সময়ে সরকার প্রধান কে হবে তার মীমাংসা হবার আগেই প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনের প্রস্ততি নেয়ার আহ্বানে রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারো অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

আরেকটি সূত্র জানায়, বিদেশীদের কাছ থেকে দ্রুত নির্বাচন দেয়ার চাপ বেড়েছে সরকারের উপর। বিরোধী জোটের সাথে সংলাপের মাধ্যমে একটি নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির কথা বলা হয়েছে। তবে বিরোধী দলকেও শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালনের কথা বলেছে তারা। ফলে গত প্রায় দুই বছর ধরে বিরোধী জোট চলমান সংকট সমাধানে সংলাপের আহ্বান জানিয়ে আসছে। এই সময়ে তাদের পক্ষ থেকে রাজপথে কোন রাজনৈতিক কর্মসূচিও দেয়া হয়নি।

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.