উত্ত্যক্তকরণের শিকার সুরাইয়া আক্তার রিসা, নিতু মণ্ডলসহ অনেকে প্রাণ হারিয়েছে। আবার সিলেটের কলেজছাত্রী খাদিজা আক্তারদের মতো অনেককে ধুঁকে ধুঁকে বাঁচতে হচ্ছে। সন্তান হারানো বা চোখের সামনে সন্তানের করুণ পরিণতি দেখে পরিবারের সদস্যরা বিপর্যস্ত। মামলা তদন্তের ধীরগতিতেও তাঁরা ক্ষুব্ধ। তাঁদের মতে, উত্ত্যক্তকারীর দৃষ্টান্তমূলক সাজা হয়েছে তা দেখতে পেলে মনের যন্ত্রণা কিছুটা কমবে। অন্য অপরাধীরাও সাবধান হয়ে যাবে।


ধীরগতিতে চলছে উত্ত্যক্তকরণ মামলার তদন্ত


সম্প্রতি উত্ত্যক্তের শিকার পরিবারের সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এসব ঘটনা ঘটার পরও গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাড়া পড়ে। পুলিশ প্রশাসন তখন তৎপরতা দেখায়। মামলার আসামিও গ্রেপ্তার হয়। কিন্তু তারপর তদন্তে নেমে আসে ধীরগতি।


রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিসা হত্যাকাণ্ডের পর বখাটে ওবায়দুল হক ধরা পড়েছেন। আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি হত্যার দায় স্বীকারও করেছেন। গত ২৪ আগস্ট রিসাকে ছুরিকাঘাত করলে সে ২৮ আগস্ট ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। ঘটনার দিনই মামলা করেন তার মা তানিয়া হোসেন। এ ঘটনায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনও দেওয়া হয়েছে।


রিসার বাবা রমজান হোসেন  বলেন, ‘এই ঘটনার পর দুই মাস পার হইছে। আমার তো মনে হয় তদন্তে দেরি হইতেছে। চার্জশিট কবে দিবে জানতে চাইলে পুলিশ বলে, তারা তো আর একটা কাজ নিয়া থাকে না। দেরি হইলে নাকি মামলার কোনো ফাঁকফোকর থাকবে না। বাচ্চাটাকে বড় করলাম। চোখের সামনে ওকে মাইরা ফেলল। আমাদের কষ্ট কেউ বুঝতে চায় না। সবাই একসময় ভুইল্যা যায়, আমরা তো সন্তান হারানোর কষ্ট ভুলতে পারি না। চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না।’


বাবা আরও বলেন, এরপর আরও বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। সরকার ঘটনাগুলো নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামাচ্ছে বলে মনে হয় না। সরকার চাইলেই মামলাগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে পারে।


গত ১৮ সেপ্টেম্বর মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলায় স্কুলে যাওয়ার পথে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নিতু মণ্ডল ছুরিকাঘাতে নিহত হয়। এলাকার মানুষ একই গ্রামের মিলন মণ্ডলকে হাতেনাতে ধরে পুলিশে দেন। হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছেন মিলন।


নিতু মণ্ডলের কাকা সুজন মণ্ডল  বলেন, ‘কিছুই বুঝতে পারছি না কবে যে মামলার চার্জশিট দেবে। মামলা যে কোন পর্যায়ে আছে, তা-ও জানি না। প্রথম দিকে সবাই তৎপর ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনও দেয় নাই। এখন আমরা এসপি, সাবেক মন্ত্রী, এমপি, পুলিশসহ সবার পেছনে ঘুরছি।’


এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কালকিনির ডাসার থানার পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) বায়েজিদ মৃধা গতকাল টেলিফোনে বলেন, ‘মামলার আসামি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাইনি। আমি গত ১৫ দিন একটি প্রশিক্ষণে ছিলাম। এ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নির্দেশনা আছে।’


৩ অক্টোবরসিলেটের কলেজছাত্রী খাদিজা আক্তারের ওপর হামলার বীভৎস দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করে কেউ তা সামাজিক মাধ্যমে ছেড়ে দিলে সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়। হামলার ঘটনায় খাদিজার চাচা আবদুল কুদ্দুস বাদী হয়ে ৪ অক্টোবর বদরুল আলমকে আসামি করে সিলেটের শাহপরান থানায় মামলা করেন। বদরুল ধরা পড়ে আদালতে দায় স্বীকারও করেছেন। ছাত্রলীগ নেতা বদরুলকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়। তিনি এখন কারাগারে।


খাদিজা বর্তমানে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অস্ত্রোপচারের ৯৬ ঘণ্টা পর চিকিৎসকেরা জানান, খাদিজার আর জীবনসংশয় নেই। খাদিজার বাবা মাশুক মিয়া  জানান, আগামী ১৫ নভেম্বর মামলার শুনানির তারিখ আছে। খাদিজা আবার নতুন করে জন্ম নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ, এ ঘটনার যাতে সুষ্ঠু বিচার হয়। আর কোনো বাচ্চার যেন এ রকম অবস্থা না হয়।


শুরুতে তৎপরতা থাকে

২৪ অক্টোবর ঝিনাইদহে ছুরিকাঘাতে গুরুতর জখম হয় স্কুলছাত্রী পূজা মজুমদার। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, শহরের ‘উপশহর’ পাড়ায় সন্ধ্যায় বাড়িতে কেউ না থাকার সুযোগে পূজাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বখাটে লিটু বাড়িতে ঢোকে। লিটু উত্ত্যক্ত করছে বলে পূজা তার পরিবারকে জানিয়েছিল। পূজার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তাকে একা স্কুলে যেতে দেওয়া হতো না। ঘটনার সময় পাশের বাড়ির একজন দেখে চিৎকার করায় বেঁচে যায় পূজা।


ঘটনার দিন রাতেই পূজার বাবা বিপুল মজুমদার বাদী হয়ে লিটুসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ঝিনাইদহ সদর থানায় মামলা করেন। গতকাল টেলিফোনে বিপুল মজুমদার জানালেন, মেয়ের মুখে ২৫টি সেলাই দিতে হয়েছে। হাতের তালু ও একটি আঙুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সে শক্ত কোনো খাবার চিবিয়ে খেতে পারছে না। প্রশাসন এখন পর্যন্ত পূজার মামলা নিয়ে তৎপর। আসামিদের কয়েকজন গ্রেপ্তারও হয়েছে। এই বাবাও বললেন, আসামিদের এমন বিচার হোক, যা দেখে অন্য সন্ত্রাসীরা ভয় পায়।


আরেক অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯ অক্টোবর উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় রাজধানীতে যমজ দুই বোন সানিয়া হাবীব মীম ও আসওয়াদ হাবীব জীমকে পিটিয়ে গুরুতর জখম করেন জীবন করিম ও তাঁর সহযোগীরা। এই দুই বোন মিরপুরের বিসিআইসি কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ে। জীবন করিমকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।


মীম ও জীমের বাবা জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) প্রশিক্ষক আহসান হাবীববলেন, ‘এখন পর্যন্ত পুলিশ মামলাটি নিয়ে তৎপর। আশা করব শেষ পর্যন্ত যাতে তৎপরতা থাকে।’



ঘটনা ঘটছেই

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গতকাল ঝিনাইদহে এক জেএসসি পরীক্ষার্থীর বাবা প্রশাসনের কাছে মৌখিকভাবে তাঁর মেয়েকে উত্ত্যক্ত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন। মাত্র দুই দিন পর পরীক্ষা, তবে কিশোরীটি বখাটের ভয়ে বাড়ি থেকে বের হতে পারছে না। পরিবারের পক্ষ থেকে বখাটের পরিবার ও কিশোরীর স্কুলে বিষয়টি জানানো হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কিশোরী পরীক্ষা দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে পরিবারটি।


সরকারের কঠোর নির্দেশনা

গত বৃহস্পতিবার পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের সম্মেলনকক্ষে ত্রৈমাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভার (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৬) দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তাকে আপনারা ছাড় দেবেন না।’

পর্যালোচনা সভায় পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা নিবিড়ভাবে তদারক করতে হবে। এ ধরনের নির্দেশনার পাশাপাশি যেকোনো চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটলে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা ঘটনার দ্রুত বিচার নিশ্চিত হবে বলে আশ্বাসও দিচ্ছেন।



Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.