গুলশানে সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার ঘটনায় জিম্মি উদ্ধারে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সোয়াত বাহিনীকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়েছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই মনে করেন, এ ঘটনায় সোয়াত টিমকে প্রত্যাশিত ভূমিকায় দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ বাহিনীর সদস্যরা যে ধরনের বিশেষ অপরাধ মোকাবেলায় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন সে ধরনের অপরাধ এর আগে না ঘটায় কার্যক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা যাচাইয়ের বিষয়টি কখনও সামনে আসেনি। 

 


কিন্তু ১ জুলাই রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারি অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে জঙ্গি হামলা ও জিম্মি হত্যার ঘটনায় সে প্রশ্নটিই জোরালোভাবে উঠে এসেছে।

এ নিয়ে পরে নানান প্রশ্ন ওঠে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সোয়াত টিমের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই তাদের টিম অস্ত্রসহ সব ধরনের সরঞ্জাম নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। অভিযানের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল তারা। কিন্তু উচ্চপর্যায় থেকেই ওইদিন তাদের সেখানে (গুলশানে) অভিযান চালানো থেকে বিরত রাখা হয়েছিল। এ কারণেই তারা অভিযান চালায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই’র আদলে গড়ে তোলা হয়েছে উন্নত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশের এই বিশেষ ইউনিট স্পেশাল উইপন্স অ্যান্ড ট্যাকটিক্স (সোয়াত)। এদের হাতে রয়েছে অত্যাধুনিক অস্ত্র ও সাজ-সরঞ্জাম। রয়েছে বড় বড় হামলার ঘটনায় পরিস্থিতি মোকাবেলার বিশেষ প্রশিক্ষণ। বড় ধরনের জিম্মি ঘটনা বা বিমান ছিনতাইয়ের মতো স্পর্শকাতর মুহূর্তে এ ধরনের বাহিনীকেই অভিযান পরিচালনায় ব্যবহার করা হয় বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে। সে আলোকেই বাংলাদেশে গড়ে তোলা হয়েছে সোয়াত বাহিনী। কিন্তু গুলশানের ঘটনায় তাদের যথাযথ ভূমিকায় দেখা যায়নি বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে এ অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া। যুগান্তরকে তিনি বলেছেন, এ ধরনের অভিযান পরিচালনার জন্য সোয়াতের যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে। পুলিশের বিশেষ এ ইউনিটকে দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ দিয়ে সেভাবেই তৈরি করা হয়েছে। এ ইউনিটের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র ছাড়াও উদ্ধার অভিযান পরিচালনার সরঞ্জামও রয়েছে। ঘটনার পরপরই বিশেষ এ ইউনিট অভিযান পরিচালনার জন্য ঘটনাস্থলে ছুটে যায় এবং নিজেদের প্রস্তুত করে। তবে সরকার ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি না মেলায় সোয়াত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেনি।

তিনি আরও বলেন, পরদিন সকালে গুলশানের ওই রেস্টুরেন্টে সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্বে যে কমান্ডো অভিযান পরিচালিত হয় সেখানে দ্বিতীয় স্তরে ছিল পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট সোয়াত। এ ধরনের অভিযানের ক্ষেত্রে সোয়াতের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা ঠিক হবে না।

একাধিক সূত্র জানায়, উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই ‘সোয়াত’ নামে বিশেষ এলিট ফোর্স রয়েছে। সাধারণ পুলিশের পক্ষে যেসব অভিযান ঝুঁকিপূর্ণ, সে ধরনের কঠিন অভিযানের দায়িত্ব দেয়া হয় সোয়াতকে। ভিআইপি কেউ জিম্মি কিংবা অপহরণের শিকার হলে, বড় ধরনের কোনো হামলা হলে, ভয়ংকর সন্ত্রাসী গ্রেফতারের লক্ষ্যে গঠন করা হয় সোয়াত টিম। ২০০৮ সালের অক্টোবরে ২ জন সহকারী পুলিশ কমিশনার, ২ জন ইন্সপেক্টর, ৪ জন সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) ও ২ জন সার্জেন্টসহ মোট ২৪ জন চৌকস পুলিশ সদস্যকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয় বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য। প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফেরার পর সোয়াতের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৯ সালের ২৮ ফেব্র“য়ারি। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের অ্যান্টি টেরোরিজম অ্যাসিস্ট্যান্স (এটিএ) সোয়াত টিমের সদস্যদের সার্বিক প্রশিক্ষণ দেয়। ভার্জিনিয়ায় অত্যাধুনিক অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ নেন সোয়াত সদস্যরা।

প্রশিক্ষণের মধ্যে ছিল গ্লোক-১৭ পিস্তল ও এম-৪ রাইফেল হ্যান্ডলিং, ডায়নামিক এসল্ট, ভেহিকেল এসল্ট, টেকনিক্যাল প্ল্যানিং, ডাইভারশনালি টেকনিক প্রোগ্রাম। পরবর্তীতে সোয়াতের আরও একটি টিম যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসে। বর্তমানে সোয়াতের সদস্য সংখ্যা ৫০। সবাই যুক্তরাষ্ট্রে উন্নত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। সোয়াতের অস্ত্র, পোশাকসহ অভিযানে ব্যবহৃত সরঞ্জামও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনা হয়। শুরুতেই সোয়াতের জন্য ১২ কোটি টাকার অত্যাধুনিক অস্ত্র কেনা হয়। পরে কয়েক দফায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে অত্যাধুনিক ও হালকা অস্ত্র দেয়া হয় সোয়াতকে। ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে সোয়াতের জন্য কেনা হয়েছে দুটি সোয়াত ভ্যান (অত্যাধুনিক বুলেটপ্রুফ ভ্যান)। এর চাকা গুলিবিদ্ধ হলেও নির্বিঘ্নে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে পারে। এছাড়াও সোয়াতের জন্য আরও ১০ কোটি টাকার অস্ত্র ক্রয় প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

একটি সূত্র জানায়, সোয়াতের প্রশিক্ষণে মাথাপিছু প্রায় ২৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। কারও কারও পেছনে এর বেশিও খরচ হয়েছে। এর পুরোটাই ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দুষ্কৃতকারীদের হাতে জিম্মি লোকজনকে উদ্ধারে সোয়াত টিমের সদস্যদের বিশেষ প্রশিক্ষণ রয়েছে। একই সঙ্গে জঙ্গি হামলা মোকাবেলা ও ছিনতাই হওয়া বিমান উদ্ধার সংক্রান্ত প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে এ টিমকে। যদিও বাস্তবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ, পহেলা বৈশাখ এবং বিজয় দিবসসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে শোডাউন ছাড়া এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো তৎপরতায় যেতে হয়নি এ টিমকে। রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে তারা মূলত মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) বিভিন্ন টিমের সঙ্গে আইনশৃংখলা নিয়ন্ত্রণের কাজে প্রয়োজনমাফিক অংশ নেয়।

গত ১ জুলাই রাত পৌনে ৯টার দিকে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে জঙ্গিরা হামলা চালায়। তারা সেখানকার দেশী-বিদেশী অতিথি ও কর্মচারীদের জিম্মি করে রাখে। এর মধ্যে জঙ্গিরা দেশী-বিদেশী ২০ জিম্মিকে হত্যা করে। ওই ঘটনায় ২ পুলিশ সদস্যও নিহত হয়। জঙ্গিরা রাতভর কয়েকজন অতিথি ও বেকারি কর্মচারীকে জিম্মি করে রাখে। পরে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে কমান্ডো অভিযান চালিয়ে জঙ্গিদের কবল থেকে জীবিত জিম্মিদের উদ্ধার করা হয়। যদিও এ ধরনের ঘটনায় জিম্মিদের উদ্ধারের বিশেষ প্রশিক্ষণই মূলত দেয়া হয়েছে সোয়াতকে। সেদিন সোয়াত টিম ঘটনাস্থলে থাকলেও তাদের অভিযানে নামতে দেখা যায়নি।

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.