রাজশাহীর পুঠিয়ায় ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়ির প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে ‘ব্যাপক’ সংস্কারকাজ চলছে প্রায় দুই বছর ধরে। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার আগেই সংস্কার করা মূল ভবনের পিলার ও ছাদ এবং সীমানাপ্রাচীরের পলেস্তারা খসে পড়তে শুরু করেছে। নতুন করা রং উঠে যাওয়ায় আগের চেয়েও জীর্ণদশা ফুটে উঠছে। ফলে দেশের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটি স্বমহিমায় ফেরার পরিবর্তে আরো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কাজের নিম্নমান ও অনভিজ্ঞ শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাবে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

সংস্কার শেষ না হতেই খসে পড়ছে পলেস্তারা

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বগুড়া কার্যালয় সূত্রমতে, দ্বিতীয় দফায় প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে তিন বছর মেয়াদে রাজশাহীর পুঠিয়ার পাঁচআনি রাজবাড়িটির সংস্কারকাজ হাতে নিয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। এ কাজের মধ্যে গত বছর করা হয়েছে রাজবাড়ির সীমানাপ্রাচীর সংস্কার, দর্শনার্থীদের জন্য রাস্তা নির্মাণ এবং রাজার হাওয়াখানা সংস্কারকাজ। তার আগের বছর করা হয়েছে মূল ভবনের পিলার ও ছাদ সংস্কারের কাজ। কিন্তু এই কদিনের মধ্যেই সংস্কার করা পিলারের পলেস্তারা ও রং উঠে যেতে শুরু করেছে। ছাদের পলেস্তারা ওঠার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। আবার ফ্যাকাসে হয়ে গেছে সংস্কার করা প্রাচীরের রংও। এ নিয়ে চরম ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। গত শুক্রবার সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, মূল ভবনের সামনে বাঁশ বেঁধে সংস্কারকাজ চালানো হচ্ছে। এ কাজে নিয়োজিত কয়েকজন শ্রমিক কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁদের বাড়ি নওগাঁয়। প্রায় এক বছর ধরে তাঁরা এ সংস্কারকাজ করছেন। কাজটি হচ্ছে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের নিজস্ব তদারকিতে। একজন শ্রমিক বলেন, ‘সপ্তাহে কখনো এক দিন আবার কখনো দুই দিন এসে একজন প্রকৌশলী আমাদের দিকনির্দেশনা দিয়ে যান। আমরা সেভাবেই কাজ করি।’ 

এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো অভিজ্ঞ লোক ছাড়াই এই সংস্কারকাজ চলছে। আবার প্রাচীরের ভাঙা স্থানগুলোতে কখনো কখনো গোপনে আগের পুরনো ও নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে রং ও পলেস্তারা খসে পড়াসহ বেহাল পরিণতি হয়েছে বাড়িটির। স্থানীয় ব্যবসায়ী নিবারণ চন্দ্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সংস্কার করে ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়িটির চেহারা আগের অবস্থায় ফেরানোর কথা ছিল। কিন্তু সংস্কারের পর আরো বিশ্রী অবস্থায় পরিণত হয়েছে। কদিন আগে করা রংগুলো উঠে যাচ্ছে। সংস্কারের নামে এমন কাজ হওয়ার চেয়ে না হওয়াটাই ভালো ছিল।’ তিনি জানান, সংস্কারকাজ দেখভালের জন্য একজন প্রকৌশলী নিয়োজিত আছেন। কিন্তু তিনি নিয়মিত কাজ তদারক করতে আসেন না। সপ্তাহে এক-দুই দিন এসে শ্রমিকদের দিকনির্দেশনা দিয়েই আবার চলে যান। ফলে শ্রমিকরা ইচ্ছামতো কাজ করে গেছে। পরিমল ঠাকুর নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘এই কাজে নিয়োজিত অভিজ্ঞ কোনো শ্রমিক নেই। তারা যেভাবে পারছে, সেভাবে কাজ করছে। আর কাজের নামে সরকারি অর্থ অপচয় করছে। ফলে সংস্কার শুধু নামেই হচ্ছে, কোনো কাজে আসছে না। তিনি বলেন, যেসব স্থান রং করা হয়েছে সেগুলো ফ্যাকাসে হয়ে আরো খারাপ লাগছে। এতে আসল চেহারাটাই হারিয়ে ফেলেছে ঐতিহ্যবাহী পুঠিয়ার পাঁচআনি রাজবাড়ি। এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বগুড়ার আঞ্চলিক সহকারী পরিচালক নাহিদ সুলতানা বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে খোঁজ নিয়ে বলতে পারব।’ 

জানা গেছে, রাজবাড়ি সংস্কারের দায়িত্বে রয়েছেন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের খলিলুর রহমান নামের একজন সহকারী প্রকৌশলী। তিনিই এই কাজ দেখভাল করছেন। জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। সঠিক মানেরই কাজ হচ্ছে। আমার নির্দেশনা অনুযায়ীই পুরনো ইট ব্যবহৃত হচ্ছে। যেগুলো রাখা যাবে, শুধু সেগুলোই ব্যবহার করা হচ্ছে।’ প্রসঙ্গত, পুঠিয়া উপজেলা সদরের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়ি। জনৈক নীলাম্বর মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে রাজা উপাধি লাভ করলে বাড়িটি রাজবাড়ি হিসেবে পরিচিতি পায়। এটি পরবর্তীকালে পাঁচআনি রাজবাড়ি হিসেবেও পরিচিতি লাভ করে। ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতিতে তৈরি রাজবাড়িটি ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে চোখ জুড়ানো সব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। প্রত্নতাত্ত্বিক সৌন্দর্যের সঙ্গে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি করা এই রাজবাড়িটি একনজর দেখার জন্য প্রতিদিনই এখানে দেশি-বিদেশি পর্যটকের ভিড় লেগেই থাকত। এই রাজবাড়ির নিরাপত্তার জন্য চারদিক দিয়ে ৩০ একর দিঘি (চৌকি) কাটা হয়। এখনো এখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি রাজপ্রাসাদ, ৯টি মন্দির ও একটি মঠ। এগুলোকে সংস্কার করে আবারও প্রাচীন রূপে ফিরিয়ে আনতেই এই সংস্কারকাজ হাতে নিয়েছে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ। 

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.