বাসাবাড়িতে কাজ করেন মরিয়ম। স্বামী নেই, একার রোজগারে চলে তিন মেয়ে নিয়ে তাঁর সংসার। সামান্য বিলাসিতা করার কোনো জো নেই। পরিবারের সবার জন্য দুমুঠো অন্ন, আটপৌরে পোশাক আর প্লাস্টিক অথবা রাবারের স্যান্ডেল জোগাতেই হিমশিম অবস্থা। ১ জুলাই থেকে এ জুতা-স্যান্ডেলই ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি দরে কিনতে হবে তাঁকে। আধপেটা খেয়ে জীবন চালানো মরিয়মের জন্য এ টাকাটাই অনেক। নতুন বাজেটের প্রায় ৬০ শতাংশ অর্থ জোগাড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যবহার্য এ সস্তা দরের পণ্যটিকেও ভ্যাটের আওতায় আনা হয়েছে।

রাজস্ব থাবায় সাধারণ মানুষ

আগামী রাজস্ব বাজেট প্রস্তাবে ১২০ টাকা মূল্য পর্যন্ত প্লাস্টিক ও রাবারের চপ্পল, জুতা-স্যান্ডেলের ওপর থেকে ভ্যাট অব্যাহতি বাতিল করা হয়েছে। এতে বড় বড় শপিং মলে যাওয়ার সক্ষমতা যাদের নেই, সেসব মানুষকে ফুটপাতের ছোট্ট দোকান থেকে এসব পণ্য কিনতে হবে বেশি দামে। শুধু জুতা-স্যান্ডেল নয়, আরো অনেক পণ্যে শুল্ক কর-ভ্যাট বসায় নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে। বাড়তি ভ্যাটের আঘাত আসবে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তের জীবনেও। সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক গোলাম  মোয়াজ্জেম কালের কণ্ঠকে এ বিষয়ে বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী বড় আকারের বাজেট দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু অর্থ সংস্থানের সঠিক হিসাবটি তিনি করেননি। বাড়তি অর্থ জোগাড়ে চেষ্টায় তিনি সব শ্রেণির ভোক্তাকে বিপদে ফেলেছেন। 

এতে খুব সংগত কারণেই জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে।’ সকালের নাশতায় কিংবা দুপুর বা সন্ধ্যায় পাউরুটি, কেক, বিস্কুট খাওয়া হয় না—এমন পরিবার শহরে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এখন তো প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এসব খাবার বেশ জনপ্রিয়। আসছে অর্থবছরে ছোট্ট দোকানদারকে বেশি দাম দিয়ে এসব পণ্য কিনতে হবে। বলাবাহুল্য, এ বাড়তি দাম চুকাতে হবে সাধারণ ক্রেতাকেই। কারণ নতুন বাজেটে ১০০ টাকার বেশি দামের পাউরুটি, হাতে তৈরি কেক-বিস্কুটের ওপর থেকে ভ্যাট অব্যাহতি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। ইংরেজি মাধ্যম স্কুল এখন পাড়া-মহল্লায়। জেলা পর্যায়েও কিন্ডারগার্টেন ছড়িয়ে পড়েছে। এসব স্কুলে বেতন বাড়ানোর অজুহাত তৈরি করে দিলেন অর্থমন্ত্রী। এসব স্কুলের বেশির ভাগ পাঠ্যবই ও ব্যবহার্য সামগ্রী আমদানি করা হয়। নতুন বাজেট প্রস্তাবে শিশুদের ছবি ও অঙ্কনের বিদেশি বই আমদানির শুল্ক ৫ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। দেশে মোবাইল ফোন সংযোগের সংখ্যা ১০ কোটি ৮১ লাখ। আসছে বাজেটে অতি প্রয়োজনীয় এ খাতে রাজস্বের আঘাত হানা হলো। মোবাইল ফোনে কথা বলাসহ সব ধরনের সেবার ওপর বিদ্যমান ৩ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। এতে শুধু কথা বলায় নয়, ইন্টারনেট ব্যবহারের ব্যয়ও বাড়বে। সংসারে ওয়াশিং মেশিন এখন প্রয়োজনীয় একটি পণ্য। আগামী বাজেটে ওয়াশিং মেশিনের আমদানি পর্যায়ে শুল্ক ১ শতাংশ থেকে এক লাফে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। এ পণ্যটি দেশে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করে, যা স্থানীয় চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। ফলে নতুন বছরে বেশ চড়া দামে ওয়াশিং মেশিন কিনতে হবে।

আমাদের দেশে বেসরকারি চিকিৎসা ব্যয় ক্ষেত্রবিশেষে এত বেশি যে অনেক সময়ই অর্থ সংকুলানে সাধারণ মানুষকে ভিটেমাটি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়। আসছে অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় আরো বাড়তে পারে। হাসপাতালের কিছু যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক ধরা হয়েছে। এ ছাড়া ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাম রেকর্ডিং পেপারের ওপর রাজস্ব আরোপ করা হয়েছে। মেডিটেশন সেবায়ও বাড়তি কর দিতে হবে। বিদেশ ভ্রমণে ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে অনেকে টিকিট কেনেন। এর জন্য যাত্রীর কাছ থেকে টিকিটের মূল্যের সঙ্গে সার্ভিস চার্জ আদায় করা হয়। আসছে অর্থবছরে ট্রাভেল এজেন্সির ওপর নতুন কর বসানো হয়েছে। এতে বিদেশ যাত্রীদের বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হবে। গাড়ি মেরামত, হোটেল ভাড়া, আইপিএস, ইউপিএসে এ রাজস্বের থাবা বসায় ভোক্তাকেই বাড়তি খরচ বহন করতে হবে। রড তৈরির কাঁচামাল বিলেট আমদানিতে শুল্ক বসছে। এতে নির্মাণ খাতের এ জরুরি পণ্যটির মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হলো। 

গত কয়েক বছরের বাজেটে ধূমপায়ীদের জন্য কোনো সুখবর ছিল না। ভবিষ্যতেও থাকছে না। আবারও অর্থমন্ত্রী বিড়ি, সিগারেট, জর্দা, গুলসহ তামাকজাত পণ্যে বিভিন্নভাবে কর বাড়িয়েছেন। সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র ও মাঝারি দোকানদারদের বিপদ বাড়ল। তাঁরা প্যাকেজ ভ্যাটের আওতায় বছর শেষে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ভ্যাট দিতেন। ভ্যাট আইন ২০১২ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্যাকেজ ভ্যাট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। এর প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা রাস্তায় নামলে শেষ পর্যন্ত পিছু হটলেও তিনি আগামী অর্থবছরের জন্য প্যাকেজ ভ্যাট বাড়িয়ে দিলেন প্রায় দ্বিগুণ। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি দোকানের বিক্রেতা বাধ্য হয়েই পণ্যের দাম বাড়াবেন বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্লাস্টিক ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাফেজ হারুন। কালের কণ্ঠকে ব্যবসায়ী এ নেতা বলেন, এসব দোকানের ক্রেতা সাধারণত কম আয়ের। তাই অল্প আয়ের দোকানে দাম বাড়লে নিম্ন আয়ের ক্রেতার ওপরই তার দায় পড়বে। বিষয়টি অর্থমন্ত্রীর ভেবে দেখা উচিত ছিল। প্রসঙ্গত, বর্তমানে এনবিআরে আড়াই লাখ প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন থাকলেও ৬৮ হাজার প্রতিষ্ঠান প্যাকেজের আওতায় ভ্যাট পরিশোধ করে। এ খাতে বছরে গড়ে ১০ কোটি টাকা আয় হয় সরকারের। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে ১৪ হাজার টাকা, অন্যান্য সিটি করপোরেশনে ১০ হাজার, জেলা শহরের পৌর এলাকায় সাত হাজার ২০০, দেশের অন্যান্য এলাকায় তিন হাজার ৬০০ টাকা ভ্যাট নির্ধারিত আছে। অর্থমন্ত্রী প্রস্তাবিত বাজেটে প্যাকেজ ভ্যাটের পরিমাণ বৃদ্ধি করে এলাকাভিত্তিক যথাক্রমে সাত হাজার, ১৪ হাজার, ২০ হাজার ও ২৮ হাজার টাকা করার ঘোষণা দিয়েছেন।

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.