খাদ্যশস্যের সরকার নির্ধারিত মূল্য নিয়ে দেশের ৪৯০টি উপজেলায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এর জের ধরে টিআর (টেস্ট রিলিফ) ও কাবিখার (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) কর্মকাণ্ড যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মূল্য পুনর্নির্ধারণ না হলে উপজেলায় কর্মরত প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তারা (পিআইও) দায়িত্ব পালন থেকে স্বেচ্ছায় সরে যাবেন বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, সরকার নির্ধারিত মূল্যের সঙ্গে বাস্তব মূল্যের বিস্তর তফাতের কারণে তাঁদের বিনা দোষে দুর্নীতিবাজ সাজতে হচ্ছে।

খাদ্যশস্যের চড়া মূল্যে মাঠ প্রশাসনে ক্ষোভ

গত এপ্রিলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় চারজন পিআইওকে গ্রেপ্তার করা নিয়ে প্রতিটি উপজেলায় কর্মরত পিআইওদের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। উপজেলার বিভিন্ন উন্নয়নকাজের ব্যয় খুঁজতে গিয়ে দুদক কর্মকর্তারা খাদ্যশস্যের অর্থনৈতিক মূল্য বিবেচনায় মামলার তদন্ত করে দুই পিআইওকে অভিযুক্ত করেন। অথচ এসব উন্নয়নকাজের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকেন সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান-মেম্বাররা। 

তাঁদের বাদ দিয়ে শুধু পিআইওদের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা দায়ের ও গ্রেপ্তারের ঘটনায় সারা দেশে কর্মরত ৪৯০ জন পিআইওর মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের জন্য টিআর কিংবা কাবিখার চাল ও গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরিপত্রের আলোকে সেসব চাল ও গম বিক্রি করে প্রকল্পের সমুদয় অর্থ ব্যয় হয়ে থাকে। এই চাল-গম বিক্রির মূল্য নিয়েই বিপত্তি ঘটেছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি কেজি চাল ৩৪.১৯৫ টাকায় এবং গম ২৯ টাকা দাম ধরে বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু নিম্নমানের হওয়ায় সেগুলো বাজারে প্রতি কেজি ১৫ থেকে ১৭ টাকায় বিক্রি করতে হয়। অনেক সময় পচা গম-চাল সরবরাহ করা হলে মূল্য আরো কমে যায়। তখন দাম ১০-১২ টাকা কেজিতে নেমে আসে। বরাদ্দ করা খাদ্যশস্য বাজারে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অর্ধেকেরও কম দামে বিক্রি হলেও মাস্টার রোল (কাজ ও ব্যয় বিবরণী) দিতে হয় সরকারি মূল্য অনুযায়ী। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র এবং নথিতেও সেই টাকার কাজ হয়েছে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে স্বাক্ষর করতে হয়। 

অসন্তোষের জের ধরে সরকারের উন্নয়নমূলক কাজে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ কামাল এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রিয়াজ আহমেদ জরুরি সভা করেছেন। অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বিষয়টি সমাধানের জন্য তাঁরা ঊর্ধ্বতন মহলে জরুরি চিঠি দিয়েছেন। বলা হচ্ছে, টিআর-কাবিখার সঙ্গে সরকারের অনেক কর্মকর্তা, এমপি-মন্ত্রী জড়িত থাকলেও নিম্নমানের শস্য অর্ধেকেরও কম দামে বিক্রির দায় শুধু পিআইওদের ওপর বর্তাবে কেন? দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব জাকির হোসেন আখন্দ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সরবরাহ করা খাদ্যশস্য অর্ধেকেরও কম দামে বিক্রি করে আমাদের উন্নয়নমূলক কাজ করতে হচ্ছে। অথচ প্রকল্পের কাজ ও ব্যয় বিবরণী (মাস্টার রোল) তৈরির সময় সরকার যে দামে খাদ্যশস্য সরবরাহ করে সেই একই দাম দেখাতে হয়। এটা অনৈতিক। বিষয়টির সমাধান হওয়া উচিত। এ জন্য আমরা অনেক দিন ধরে বলছি, আমাদের খাদ্যশস্যের পরিবর্তে নগদ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হোক। কিন্তু বিভিন্ন সভায় সিদ্ধান্ত হলেও এখন পর্যন্ত আমরা নগদ টাকা পাইনি।’ তিনি জানান, বিষয়টি সম্পূর্ণ খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের। অথচ এর সব দায় চাপানো হচ্ছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের ওপর। ইতিমধ্যে অধিদপ্তরের আওতাধীন চারজন পিআইওকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে দুদকের মামলায়। অথচ টিআর-কাবিখার কাজে প্রতিটি প্রকল্পের সভাপতি কিংবা চেয়ারম্যান হলেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কিংবা অন্য কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি। প্রকল্পের ভালোমন্দের সব দায়িত্ব তাঁদের। এ ক্ষেত্রে পিআইওরা সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে কাজের তদারকি করেন মাত্র। জানা যায়, খাদ্যশস্যের সরকারি মূল্য এবং বাস্তব মূল্যে বড় ধরনের তফাতের জন্য ডিও (চাহিদাপত্র) সিন্ডিকেট, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নিম্নমানের চাল-গম আমদানিকে দায়ী করা হয়ে থাকে। এর সঙ্গে খাদ্যশস্যের ঘাটতির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। 

এসব পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অর্থ ব্যয় হলেও এর জন্য আলাদা কোনো সরকারি বাজেট থাকে না। ফলে পদ্ধতিগত কারণেই টিআর-কাবিখা দুর্নীতির অভিযোগ থেকে রেহাই পায় না। বরাদ্দের ১০০ শতাংশ কাজ করলেও প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের ঘাড়ে দুর্নীতির দায় চাপে। এর সত্যতা স্বীকার করেছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট অনেকেই। খুলনা দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো চিঠিতে বাগেরহাট-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং খুলনার সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, ‘টিআর-কাবিখার চাল-গম বেশির ভাগই নিম্নমানের হয়ে থাকে। তা ছাড়া এ ব্যবসার সঙ্গে কিছু অসৎ ব্যবসায়ী জড়িত থাকেন বলে কখনো সঠিক মূল্য পাওয়া যায় না। ফলে এসব খাদ্যশস্য বিক্রির শতভাগ টাকায় কাজ করলেও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দুর্নীতিবাজ সাজতে হয়। তাই এ ব্যাপারে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনাটা অমানবিক।’ এসব প্রকল্পের সঙ্গে এমপি, মন্ত্রী, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ইউএনও, ইউপি চেয়ারম্যান এবং মেম্বাররা সরাসরি জড়িত থাকেন। এ ধরনের কাজ বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি উপজেলায় একজন করে পিআইও কাজ করেন। অথচ বর্তমানে শুধু পিআইওদের দোষী বানানোর ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ করেন বাংলাদেশ পিআইও সমিতির একাধিক কর্মকর্তা। 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারের নিয়ম অনুযায়ী খাদ্যশস্যের অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে কারিগরি অসুবিধা হলে ভর্তুকি দেখিয়ে বিষয়টি সমাধান করা সম্ভব। 

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.