বিশ্বশান্তি, উন্নয়ন ও মুসলিম উম্মাহর জন্য একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ। গতকাল রবিবার স্থানীয় সময় দুপুরে জেদ্দায় সৌদি বাদশাহর বাসভবন আল সালাম প্যালেসে দুই দেশের নেতার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এ অঙ্গীকার আসে। 

বিশ্বশান্তি ও উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করবে ঢাকা ও রিয়াদ

বৈঠকের পর পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক ও প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব ইহসানুল করিম আলোচনার বিষয়বস্তু সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন। তাঁরা জানান, প্রায় ঘণ্টাব্যাপী অন্তরঙ্গ পরিবেশে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব বিষয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী ও সৌদি বাদশাহ বৈঠকে উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্ভাবনাগুলো খতিয়ে দেখার বিষয়েও একমত হন। পররাষ্ট্রসচিব জানান, সৌদি বাদশাহ বাংলাদেশকে শীর্ষ ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘বাংলাদেশ সমগ্র মুসলিম উম্মাহর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র।’ সৌদি বাদশাহ দুইবার একই শব্দ উচ্চারণ করেন। 

প্রধানমন্ত্রীর সৌদি আরব সফর দুই দেশের মধ্যে নতুন অধ্যায়ের সূচনাই শুধু নয়, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও এর মাধ্যমে এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হলো বলেও পররাষ্ট্রসচিব অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক যে পূর্ণতা লাভ করল, তা আগে কখনো দেখা যায়নি। সৌদি বাদশাহ মনে করেন, বিশ্বশান্তি, প্রগতি ও উন্নয়নে বাংলাদেশের একটা বিরাট ভূমিকা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বশান্তির অন্বেষণ, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নে সৌদি আরবের সঙ্গে একযোগে কাজ করে যেতে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দুই নেতা বৈঠকে সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রপন্থার বিরুদ্ধেও তাঁদের কঠোর অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন বলেও পররাষ্ট্রসচিব জানান। সন্ত্রাস ও উগ্রপন্থা মোকাবিলায় বাংলাদেশের ‘ইসলামী জোটে’ শরিক হওয়ার বিষয়ে বাদশাহ সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, এই কনসেপ্টের দুটি অংশ রয়েছে, একটি সামরিককেন্দ্রিক এবং অন্যটি রাজনৈতিক। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ কোন অংশে যোগ দেবে, এটা বাংলাদেশের ওপরই নির্ভরশীল, এটা বাধ্যতামূলক নয়, এটা স্বেচ্ছাকেন্দ্রিক। 

আমরা বাংলাদেশের এই জোটে যোগদানের বিষয়টিতেই খুশি।’ পররাষ্ট্রসচিব ও প্রেসসচিব জানান, দুই নেতা বর্তমান বিশ্বে বিদ্যমান অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাহীনতা দূর করতে একসঙ্গে কাজ করে যাওয়ার বিষয়েও অঙ্গীকার করেন। সৌদি বাদশাহ বলেন, তাঁর দেশ বাংলাদেশের ইসলামী জোটে অংশগ্রহণের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং এর মাধ্যমে উভয় দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে উঠছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সৌদি আরব বরাবরই বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের একটি বিশেষ জায়গা দখল করে রয়েছে। কারণ মক্কা এবং মদিনায় দুটি পবিত্র মসজিদের অবস্থান রয়েছে এবং সৌদি আরব রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মভূমি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদেরকে ইসলামের প্রকৃত মর্মবাণী উপলব্ধি করতে হবে, যাতে কেউ এর ভুল ব্যাখ্যা করে কোনো রকম ফায়দা লুটতে না পারে।’ এ প্রসঙ্গে তিনি সারা দেশে ৫৬০টি ইসলামিক কেন্দ্র গড়ে তোলায় তাঁর সরকারের উদ্যোগের তথ্য তুলে ধরে বলেন, এর মাধ্যমে ইসলামের শান্তির বাণী সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াই আসল উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ, প্রগতিশীল ও সব ধর্মাবলম্বীদের বসবাসের উপযোগী বাংলাদেশ গড়ে তোলাই তাঁর লক্ষ্য বলেও জানান। 

প্রধানমন্ত্রীর ইসলামিক সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের বিষয়ে সৌদি বাদশাহ সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা তাঁর (শেখ হাসিনার) কনসেপ্টের বিষয়ে খুব খুশি এবং এ বিষয়ে সহযোগিতাও করতে চাই।’ তিনি বিষয়টি বাংলাদেশে এসে দেখে যাওয়ার জন্য একজন সিনিয়র মন্ত্রীকেও বাংলাদেশে পাঠানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী ইসলামী সংস্কৃতি, আরবি ভাষা এবং ইসলামের মূল দর্শন প্রচারের মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে সব অপপ্রচার দূর করতে ঢাকায় একটি ইসলামিক এরাবিক ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথাও জানান। শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকার এরই মধ্যে ডিজিটাল ভার্সনে বাংলা, আরবি ও ইংরেজি ভাষায় কোরআন শরিফ প্রকাশ করেছে। যাতে করে তরুণ প্রজন্ম সহজেই পবিত্র কোরআন শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। বিষয়টি শুনে সৌদি বাদশাহ খুবই আনন্দিত হন এবং এ ব্যাপারে বাংলাদেশকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন বলেও প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়। বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসায় অংশীদার হোন : বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, সমৃদ্ধি ও লভ্যাংশের অংশীদার হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের কোটি মানুষের জীবনমানের পরিবর্তনের প্রচেষ্টায় শরিক হতে সৌদি আরবের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল রবিবার সকালে জেদ্দা চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (জেসিসিআই) নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে শেখ হাসিনা এ আহ্বান জানান। বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের এ বিষয়ে জানান। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যেই নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত সমৃদ্ধ দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য পূরণে আমি সৌদি ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তা নেতাদের আমাদের দেশে বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, সমৃদ্ধি ও লভ্যাংশের অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।...সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই আমরা কোটি মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন আনতে পারব।’ 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিল্পসমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে তাঁর সরকার দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে এবং তথ্যপ্রযুক্তি-শিল্পের জন্য একাধিক হাইটেক পার্ক নির্মাণ করা হচ্ছে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হচ্ছে। শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যকার চমৎকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিমাণ অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিমাণ ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারত। দ্বিপক্ষীয় ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধির এখানে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময় জেসিসিআইর ভাইস চেয়ারম্যান মাজেন এম ব্যাটারজি তাঁর বক্তব্যে দ্বিপক্ষীয় ব্যবসা-বণিজ্য বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সৌদি আরবের ব্যবসায়ীদের জন্য বাংলাদেশ ‘সেকেন্ড হোম’ হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ব্যবসার সুযোগ-সুবিধা খতিয়ে দেখার জন্য জেসিসিআই বাংলাদেশে একটি ব্যবসায়ী দল পাঠাবে।’

 এ সময় অন্যান্যের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. আবুল কালাম আজাদ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমান, এফবিসিসিআই সভাপতি আব্দুল মাতলুব আহমাদ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে নির্মাণশিল্পে প্রকৌশলী এবং স্থাপত্যবিদসহ দক্ষ জনশক্তি সরবরাহে সৌদি আরবের বাওয়ানি গ্রুপ এবং বাংলাদেশের সেনা কল্যাণ সংস্থার মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারকও সই হয়। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. আবুল কালাম আজাদ এবং বাওয়ানি গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক ফখির আল সাওয়াফ স্মারকে সই করেন। আইডিবিকে সুদের হার কমাতে বললেন শেখ হাসিনা : ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) ঋণের সুদের হার কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শনিবার সন্ধ্যায় আইডিবির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ড. আহমেদ তিকতিক জেদ্দায় রয়্যাল কনফারেন্স প্যালেসে সাক্ষাৎ করতে এলে শেখ হাসিনা এ আহ্বান জানান। 

সাক্ষাতের পর পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক ও প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের বিস্তারিত জানান। আইডিবির সদস্য দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তেল আমদানির জন্য আইটিএফসি থেকে ঋণ নিয়ে থাকে। আহমেদ তিকতিক প্রধানমন্ত্রীকে জানান, আইডিবি মুসলিম দেশগুলোতে বড় ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পে অর্থায়নের লক্ষ্যে একটি ইসলামী ইনফ্রাস্ট্রাকচার ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। জবাবে শেখ হাসিনা এ ধরনের একটি উদ্যোগে অংশ নিতে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা জানান। নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে শেখ হাসিনার সহায়তা চায় ওআইসি : বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনে (ওআইসি) এ অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে সহায়তা চেয়েছেন সংস্থাটির মহাসচিব ইয়াদ বিন আমিন মাদানি। শনিবার রাতে জেদ্দা কনফারেন্স প্যালেসে শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে এ কথা বলেন তিনি। ওআইসি মহাসচিব বলেন, ‘বাংলাদেশ এনজিও, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করে আন্তর্জাতিক বিশ্বে স্বীকৃতি অর্জন করেছে।...এই সাফল্যকে বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশের কাছে তুলে ধরার জন্য আমরা বাংলাদেশের, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সহযোগিতা চাই।’ প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রী ওআইসি মহাসচিবের অনুরোধের জবাবে বলেন, ওআইসি এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠালে বাংলাদেশ এ বিষয়ে সহযোগিতায় প্রস্তুত রয়েছে। 

বৈশ্বিক উন্নয়নে বাংলাদেশের অগ্রণী ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে ওআইসি মহাসচিব বলেন, বাংলাদেশের অগ্রগতিতে আশান্বিত হয়ে তাঁর সংস্থা এ বিষয়ে নতুন করে পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে এনজিওর কার্যক্রম ও ক্ষুদ্রঋণের অভিজ্ঞতা ওআইসিতে কাজে লাগাতে মাদানি প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চেয়েছেন। সব দেশেই নিজস্ব দূতাবাস ভবন হবে : রিয়াদে বাংলাদেশের দূতাবাস ভবন ও রাষ্ট্রদূতের বাসভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে শেখ হাসিনা বলেছেন, বিশ্বব্যাপী কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকা প্রতিটি দেশেই বাংলাদেশ মিশনের নিজস্ব ভবন হবে। শনিবার রাতে জেদ্দা কনফারেন্স প্যালেসে এক অনুষ্ঠানে রিয়াদে এই নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি। শেখ হাসিনা বর্তমানে বাদশাহর আমন্ত্রণে পাঁচ দিনের সরকারি সফরে সৌদি আরবে রয়েছেন।

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.