ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের হিসাব মেলাতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত কাউকেই ছাড় দিলেন না। নতুন ভ্যাট আইন পুরোপুরি কার্যকর না করার কথা বললেও এর আওতা থেকে রেহাই মেলেনি কারো।

আয় সন্ধানী বাজেট

লাশ ও রোগীবাহী অ্যাম্বুল্যান্স ছাড়া সব ধরনের যানবাহনের ওপর ভ্যাট আরোপ করেছেন তিনি। সংবাদপত্রে প্রকাশের জন্য কারো মৃত্যুবিষয়ক বিজ্ঞাপন বাদে সব ধরনের ক্লাসিফায়েড বিজ্ঞাপনে ভ্যাট আরোপ করেছেন। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি বা তার কোনো সনদ হারিয়ে গেলে বিজ্ঞাপন দিয়ে তা খুঁজতে যাওয়ার আগেও সরকারকে টাকা দিয়ে যেতে হবে। সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিরতদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে বেতন ১৬ হাজার টাকা হলেই। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও করমুক্ত আয়সীমায় কোনো ছাড় দেননি অর্থমন্ত্রী। বরং ধনী-গরিবের বৈষম্য কমানোর কথা বলে ধনীদের ওপর সম্পদকর বাড়িয়েছেন। শিশুদের বিনোদনের সুযোগ বাড়াতে বেশ কিছু রাইডের আমদানি শুল্ক তুলে নিলেও ইংরেজি মাধ্যম ও বেসরকারি উচ্চশিক্ষায় ভ্যাট রেখে দিয়েছেন তিনি। 

সার্বিকভাবে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু না থাকলেও তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের করপোরেট কর ৩৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে নামানোর কথা বলেছেন মন্ত্রী। চলতি অর্থবছরে দুই লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণাকালে অর্থমন্ত্রী জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে এক লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের হিসাব করেছিলেন। তবে আদায় কম হওয়ায় অর্থবছরের শেষ সময়ে সেখান থেকে লক্ষ্যমাত্রা ২৬ হাজার কোটি টাকা কমাতে হয়েছে তাঁকে। এ অবস্থার মধ্যে গতকাল জাতীয় সংসদে নিজের দশম এবং মহাজোট সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে তৃতীয়বারের মতো তিন লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। তাতে রাজস্ব বোর্ডকে দুই লাখ তিন হাজার ১৫২ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। এনবিআর-বহির্ভূত খাতসহ আগামী অর্থবছরে (২০১৬-১৭) মোট দুই লাখ ৪২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের হিসাব করেছেন তিনি। অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, এটি আসলেই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা। তবে তা অর্জন করার মতো জনবল ও সক্ষমতা এনবিআরের রয়েছে। এত উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা সত্ত্বেও বাজেটে ঘাটতি থাকছে ৯৭ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা। 

এই ঘাটতি মেটাতে আরো বেশি সুদ গুনতে হবে অর্থমন্ত্রীকে। কয়েক বছর ধরে ৭ শতাংশের ঊর্ধ্বে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনের স্বপ্ন দেখলেও তা পূরণ হয়নি। অগত্যা চলতি অর্থবছরের বাজেটে প্রবৃদ্ধির স্বপ্নে কাটছাঁট করে ৬ শতাংশের বৃত্ত ভেঙে ৭-এর ঘর স্পর্শ করার কথা বলেন। সেই সুসংবাদ দিয়েই গতকাল সংসদে এবারের বাজেট বক্তৃতা শুরু করেন অর্থমন্ত্রী। নতুন অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৭.২ শতাংশ অর্জন করার কথা শোনালেন। কিন্তু এ জন্য যে বাড়তি বিনিয়োগ দরকার বেসরকারি খাতের কাছ থেকে, তাদের জন্য বাজেটে নতুন কোনো সুবিধা রাখলেন না। উন্নয়নের উচ্চ শিখরে পৌঁছতে হলে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। সে জন্য স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার করে বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বলেছেন তিনি। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কামনা করেছেন। জোর দিয়েছেন বিপুল যুবশক্তির কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর। বিপুল বিনিয়োগ বৃদ্ধি ছাড়া ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পরের কথা, ৮ শতাংশ অর্জনই যে সম্ভব হবে না, তা সাফ স্বীকার করেছেন মুহিত।

 ‘বর্তমানে জিডিপির অনুপাতে মোট বিনিয়োগ ২৯.৪ শতাংশ। কিন্তু মধ্যমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির জন্য এ পরিমাণ বিনিয়োগ যথেষ্ট নয়। নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ গত কয়েক বছর ধরে জিডিপির ২১-২২ শতাংশের মধ্যেই সীমিত রয়েছে। অথচ মধ্যমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য এ হার ২৭ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন’, যোগ করেন মুহিত। ব্যবসায় সহায়তা করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) খাতের কর অব্যাহতির সীমা বছরে ৩০ লাখ টাকা টার্নওভার থেকে বাড়িয়ে ৩৬ লাখ করা হয়েছে। ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তার জন্য বিশেষ সুবিধার সীমা বাড়বে। নেই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের জন্যও তেমন কোনো সুখবর। শুধু মার্জিন ঋণ ও সুদ মওকুফজনিত সুবিধার করযোগ্যতা থেকে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর আশা, ‘ফটকাবাজির অবসান ও নির্মূলের ফলে বাজারটি এবার জেগে উঠবে।’ এবারের বাজেট বত্তৃদ্ধতায় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করা নিয়ে কথা বলেননি অর্থমন্ত্রী। বিনিয়োগ খরা প্রসঙ্গেও তেমন কিছু বলেননি। 

নির্ধারিত হারে জরিমানা দিয়ে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার পুরনো প্রথাই বহাল রেখেছেন। তবে প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে যে প্রচুর পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে, তা নানা উদ্যোগেও যে রোধ করা যাচ্ছে না সেটা কার্যত স্বীকার করেছেন তিনি। পাচার ঠেকানোর বাড়তি চেষ্টা হিসেবে এনবিআরে স্বতন্ত্র একটি ইউনিট প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন তিনি। অর্থপাচার রোধে আবাসন খাতের মালিকরা এখাতে তা বিনিয়োগের সুযোগ চেয়েছিলেন। ২০ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনেরও অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু দেশের অন্যতম বৃহত্তম আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের এসব অনুরোধ রাখেননি অর্থমন্ত্রী। তিনি কেবল সিটি করপোরেশনভুক্ত এলাকার বাইরে ভবন নির্মাণে হ্রাসকৃত হারে কর নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমাদের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় প্রধান প্রতিবন্ধক এখন মনে হয় অনিশ্চিত স্থানীয় শাসনব্যবস্থা। বিশ্বে প্রায় ৫০-৬০টি দেশ আছে যাদের জনসংখ্যার চেয়ে আমাদের জেলা পর্যায়ের জনসংখ্যা বেশি। এ ঘনবসতির স্বল্প আয়তনের দেশে ক্ষমতার প্রতিসংক্রম ছাড়া কোনো উপায়েই উন্নয়ন উদ্যোগে এমন গতিশীলতা পাওয়া যাবে না, যাতে বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ১০ শতাংশে পৌঁছতে পারে। তাই স্থানীয় শাসনব্যবস্থার গুণগত সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। এ শাসনব্যবস্থায় স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব ও ক্ষমতা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।’ বিপুল পরিমাণ যুব কর্মশক্তিকে কাজে লাগানোর ওউপর গুরুত্ব দিয়ে মুহিত বলেন, ‘অফুরন্ত প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা ক্রমবর্ধিঞ্চু যুবশক্তিকে কাজে লাগানোর এক মাহেন্দ্রক্ষণ আমাদের দ্বারপ্রান্তে। 

এ জন্য একটি সমন্বিত ও ব্যাপকভিত্তিক কর্মযজ্ঞ শুরুর এখনই উপযুক্ত সময়।’ যুবশক্তিকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে আগামী অর্থবছরের শুরুর দিকেই মানবসম্পদ উন্নয়ন তহবিল নামে একটি পৃথক তহবিল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।  চলতি অর্থবছর মূল্যস্ফীতির কোনো লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা ছিল না। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দরপতনের কারণে বিভিন্ন পণ্যের দরপতন ঘটেছে। দেশেও ফসলের ভালো ফলন হয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যেই সীমিত থেকেছে অর্থবছরজুড়ে। আগামী অর্থবছরেও তেলের দাম না বাড়ার পূবার্ভাস থাকায় মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৫.৮ শতাংশ প্রস্তাব করেছেন মুহিত। অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল থাকলেও দেশে যখন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ে, তখন মূল্যস্ফীতিও বাড়ে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ২০১৮ সালের আগে শিল্পে গ্যাস সংযোগ দেওয়া সম্ভব নয়—সরকারের এমন ঘোষণায় বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা নেমে আসাও মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখতে ভূমিকা রেখেছে। 

অবশ্য অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তব্যে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ স্থবিরতা কেটে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন। আগামী অর্থবছরের বাজেটে এক লাখ ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) তে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রতিবছরই এডিপিতে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করে তা খরচ করতে পারেন না কর্মকর্তারা। এ অবস্থায় নতুন অর্থবছর থেকে প্রকল্পের প্রস্তুতিমূলক কাজ আগেই সম্পন্ন করবে সরকার। এ কাজের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি প্রকল্পের জন্য একজন স্বতন্ত্র প্রকল্প পরিচালক (পিডি) থাকবেন। একজন কর্মকর্তা একই সঙ্গে একটি প্রকল্পেই পিডির দায়িত্ব পালন করবেন। প্রকল্প প্রণয়নের সময়ই তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হবে। নতুন অর্থবছর গঠন করা হবে ‘প্রকল্প পরিচালক পুল’। ভ্যাট আইন আংশিক কার্যকর করতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের রুষ্ট করলেও অন্যভাবে তাদের আবার তুষ্ট করার চেষ্টা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এত দিন পণ্যের দাম নির্ধারণে সরকারের অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন হতো। অর্থাৎ, কোনো ব্যবসায়ী চাইলেই তার পণ্যের দাম যেমন খুশি তেমন নির্ধারণের সুযোগ পেত না। নতুন অর্থবছর থেকে ব্যবসায়ীরা নিজেরাই নিজেদের পণ্যের দাম নির্ধারণ করতে পারবে, এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো অনুমোদন নেওয়ার দরকার পড়বে না বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। মুক্তবাজার অর্থনীতির দোহাই দিয়ে মন্ত্রীর এ সিদ্ধান্তের খেসারত দেশের কম-বেশি সব মানুষকেই দিতে হবে। কারণ, ব্যবসায়ীরা নিজেরা নিজেদের ইচ্ছায় পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে নির্ধারণ করতে পারবে। আর পণ্যের দাম যত বেশি হবে, সরকারের ভ্যাটও তত বাড়বে। 

‘এ ব্যবস্থাটিকে (মূল্য নির্ধারণে সরকারের অনুমোদন নেওয়া) সম্পূর্ণভাবেই বিলুপ্তির প্রস্তাব করছি। এতে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ ভবিষ্যতে কার্যকর করার পথটি প্রশস্ত হবে।’ তবে কৃষক যাতে ধানের মূল্য পায়, সে জন্য চাল আমদানির ওপর আরোপিত শুল্কহার ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করায় ভোক্তাদের বেশি দামে চাল কিনতে হলেও কৃষকের লোকসান কমায় তা মেনে নেবেন ভোক্তারা। রাজস্ব বাড়াতে গিয়ে এ বছর ভ্যাট আইন কার্যকর করা শুরু করার সময়ই জানিয়ে রাখলেন এক বছর পর থেকে নতুন আরেকটি আইন কার্যকর করবে সরকার। দেশের মানুষের কাছ থেকে কার্যকরভাবে আয়কর আদায় করার জন্য ‘প্রত্যক্ষ কর আইন’ ২০১৮ সালের জুলাইয়ে পাস করার কথা আগাম জানিয়ে রাখলেন অর্থমন্ত্রী। সরকারি চাকরির একটিই মোহ, শেষ বয়সে মোটা অঙ্কের অর্থ মেলে পেনশনে। এই পেনশনে চাকরিজীবীর কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়া হয় না। পুরোটাই দেওয়া হয় সরকারি তহবিল থেকে। পৃথিবীর খুব কম দেশেই এ ধরনের ফ্রি পেনশন সুবিধা রয়েছে। 

অর্থমন্ত্রী এবার সেখানেও সাশ্রয় করার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘ভবিষ্যতে যোগদানকারী সব সরকারি চাকরিজীবীর জন্য বিদ্যমান পেনশন পদ্ধতি পরিবর্তন করে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পেনশন পদ্ধতি চালু করব।’ অর্থাৎ পেনশনের জন্য চাকরিজীবীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে টাকা নেবে সরকার। তার সঙ্গে সরকারের তহবিল থেকে টাকা যোগ করে পেনশন দেওয়া হবে। এ ছাড়া পর্যায়ক্রমে আধাসরকারি ও ব্যক্তি খাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ও স্ব-কর্মসংস্থানে নিযুক্ত কর্মজীবীসহ সব জনগোষ্ঠীর জন্য সরকার নিয়ন্ত্রিত একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা প্রণয়ন করা হবে। তিন লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করতে গতকাল অর্থমন্ত্রীকে ১১৮ পৃষ্ঠার একটি বই পড়তে হয়েছে। পড়া শুরুর পরপরই স্পিকারের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে তিনি বসেই শেষ করেছেন তাঁর বক্তব্য। এতে মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার কথা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথা, আর ১০টি বাজেট পেশ করার তাঁর দুর্লভ কৃতিত্বের কথা আছে। কিন্তু নেই কৃষক-শ্রমজীবী মানুষের আয় ও শিক্ষার মান বাড়ানো, কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো কর্মসূচির কথা। 

রাজস্ব আয় বাড়ানোর ব্যাপক আয়োজন রয়েছে এবারের বাজেট বক্তব্যে, তবে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার চাপ থেকে সাধারণ মানুষের সুরক্ষার তেমন কিছু খুঁজে পাওয়া যায় না। অথচ বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজেটের আকার প্রায় চার ট্রিলিয়ন ডলার। দেশটির চলতি বাজেটের বক্তব্য আর প্রাসঙ্গিক পুস্তিকার পৃষ্ঠাসংখ্যা সব মিলিয়ে ৯৩টি। যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী জর্জ ওসবোর্ন গত ১৬ মার্চ তাঁর বাজেট বক্তব্য শেষ করেছেন ১৬ পৃষ্ঠায়। সংক্ষিপ্ত এ বক্তব্যে তিনি ব্রিটেনের অর্থনীতির রূপরেখা তুলে ধরে বলেছেন, তাঁর বাজেটে পরবর্তী প্রজন্ম পাবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ভারতের বাজেটের আকার ১৯ লাখ ৭৮ হাজার কোটি রুপি। ফেব্রুয়ারিতে দেশটির অর্থমন্ত্রী অরুন জেটলির বাজেট বক্তব্য শেষ হয়েছে ৭৭ পৃষ্ঠায়। এর মধ্যেই উঠে এসেছে দ্রব্যমূল্য সহনীয় রাখার জন্য ৯০০ কোটি রুপির তহবিল গঠনের কথা, পাঁচ লাখ রুপির নিচে যাদের আয় তাদের এবং শহরে আবাসন সুবিধা নেই এমন বেসরকারি চাকুরেদের জন্য কর অব্যাহতির কথা। এসব বাজেট বক্তব্যে বাংলাদেশের বাজেট বক্তব্যের মতো কোনো স্তুতিবাক্য নেই, বড় বড় অঙ্ক আর সারণি নেই, ইতিহাস নেই, ভবিষ্যতের অসম্ভব স্বপ্ন নেই। রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়্যারমান আব্দুল মজিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, বাজেট ক্রমন্বয়ে বাড়ানো হচ্ছে। এ বছর রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অনেক উচ্চ। আগের বছরের চেয়ে বেশি। কিন্তু রাজস্ব আদায়ের বাস্তব অর্জনের তুলনায়ও বেশি। কারণ এটি অর্জন করা সম্ভব হবে না। তবে অর্জনে ঐকান্তিক প্রচেষ্টা থাকলে কিছুটা করা সম্ভব হবে।’ আব্দুল মজিদ বলেন, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধিতে কারদাতার সংখ্যা ও ট্যারিফ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে সব কিছুই নির্ভর করছে অর্থনীতি চালনার ওপর। কারণ অর্থনীতি চলমান বা গতিশীল না থাকলে অর্জন সম্ভব হবে না। অর্থনীতি চলমান থাকে ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি হয়, তবেই বর্ধিত রাজস্ব পাওয়া যেতে পারে। রাজস্ব বোর্ডের দক্ষতাকেও কাজে লাগিয়ে বর্ধিত রাজস্ব আসতে পারে। অর্থনীতি চলমান, বিনিয়োগ ও আদায়ে সচেষ্ট থাকলে রাজস্ব আদায়ে কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব হবে। তবে পুরোপুরি অর্জিত হবে না।’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, রাজস্ব আদায়ের প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বেশি হলে ঘাটতির পরিমাণ কমে। তবে এডিপি ও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে সক্ষমতা আছে বলে মনে হয় না।’ সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, রাজস্ব ব্যয়ের বড় অংশই ব্যয় হবে অনুন্নয় খাতে। কিন্তু উন্নয়ন খাতের মধ্যে শিক্ষা ও রেল যোগাযোগে বরাদ্দ ইতিবাচক মনে হচ্ছে।’

 তিনি বলেন, প্রয়োজনীয়তার নিরিখে কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাজস্ব আদায় বাড়ানো হয়েছে, কোথাও আবার ছাড় দেওয়া হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক রাজস্ব কিভাবে বাড়ানো যায়, সেই বিষয়টি দেখতে হবে। দীর্ঘদিন বিনিয়োগ থমকে আছে। বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তাহলেই রাজস্ব আদায় বাড়বে। ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে ফেরত দেওয়া হচ্ছে না। সেই ব্যাংকে আবারও টাকা পাঠানো হচ্ছে। সেই জায়গাগুলোতে ব্যবস্থা নিতে হবে।’ গতকাল বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সংসদে বাজেট বক্তৃতা শুরু করেন। তার আগে সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদের বিশেষ বৈঠকে আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ও চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। বাজেট উপস্থাপনের আগে সরকারের সাফল্যচিত্র তুলে ধরে সাত মিনিটের একটি ভিত্তিও চিত্র দেখানো হয়। তাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সাফল্যচিত্র তুলে ধরা হয়। শারীরিক অসুস্থতার কারণে ১১৮ পৃষ্ঠার বাজেট বত্তৃদ্ধতার কিছু অংশ বসে পড়ে শোনান অর্থমন্ত্রী। 

বাকি অংশ পঠিত বলে গণ্য করেন স্পিকার। বাজেট বক্তৃতা শেষে অর্থমন্ত্রী অর্থ বিল ২০১৬ সংসদে উত্থাপন করেন। সরকারের আর্থিক প্রস্তাবাবলি কার্যকরণ এবং কতিপয় আইন সংশোধনের লক্ষ্যে বিলটি উত্থাপন করা হয়। বিলটি আগামী ৩০ জুন পাস হবে। একনজরে প্রস্তাবিত বাজেট ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য তিন লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। এটি জিডিপির ১৭.৪ শতাংশ। এর মধ্যে মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। এই আয়ের মধ্য থেকে দুই লাখ তিন হাজার ১৫২ কোটি টাকা আসবে এনবিআরের আওতাভুক্ত ভ্যাট, আয়কর ও শুল্কব্যবস্থা থেকে। সরকারের বিভিন্ন সেবা ও প্রশাসনিক ফি থেকে ৩২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা এবং এনবিআর-বহির্ভূত করব্যবস্থা থেকে সাত হাজার ২৫০ কোটি টাকা আদায় করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। ব্যয়ের মধ্যে অনুন্নয়ন রাজস্ব ব্যয়ে বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক লাখ ৮৮ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা। আর উন্নয়ন খাতে ব্যয় হবে এক লাখ ১৭ হাজার ২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। নতুন অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি থাকছে ৯৭ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক উৎস থেকে ৩৬ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা, ব্যাংক থেকে ৩৮ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা ও সঞ্চয়পত্র থেকে ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা ঋণ নেবে সরকার। 

চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট অনুমোদন চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল দুই লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। সেখান থেকে সংশোধন করে তা দুই লাখ ৬৪ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। সংশোধনকালে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা দুই লাখ আট হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা থেকে নামিয়ে এক লাখ ৭৭ হাজার ৪০০ কোটিতে আনা হয়েছে। এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা এক লাখ ৭৬ হাজার ৩৭০ কোটি থেকে কমিয়ে আনা হয়েছে দেড় লাখ কোটিতে। এডিপির বরাদ্দ ৯৭ হাজার কোটি টাকা থেকে ৯১ হাজার কোটিতে, অনুন্নয়ন ব্যয় এক লাখ ৮৪ হাজার ৫৫৯ কোটি থেকে এক লাখ ৬৩ হাজার ৭৫১ কোটি এবং বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ৮৬ হাজার ৬৫৭ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৮৭ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা।

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.