স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নির্যাতনের ঘটনাটি এখন অনলাইনের মূল আলোচনার বিষয়। আমেরিকার এই বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ব্রক টারনার অভিযুক্ত। ২০১৫ সালের ১৮ জানুয়ারি টারনারকে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ডাম্পস্টারের পেছনে এক অচেতন নারীকে যৌন নিপীড়ন করতে দেখা যায়।

'আমাকে ধর্ষণের পর...'


পরে আদালতে নিপীড়িতা এ অপরাধ, তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং তার পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত লিখে তা সরাসরি ব্রকের কাছে হস্তান্তর করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ বিখ্যাত ব্রক। তিনি এ ক্যাম্পাসের তারকা সাঁতারু। তাকে ছয় মাসের জেল দিয়েছেন আদালত। তবে ক্যালিফোর্নিয়া কোর্টের বিচারক অ্যারোন পার্সকি জানান, টারনারের অপরাধের বিষয়ে প্রমাণপত্রের অভাব, বয়স এবং তার অনুতাপ এ ঘটনার মারাত্মক প্রতিক্রিয়াকে কিছুটা প্রশমিত করে। তবুও শাস্তি আরো বেশি হওয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন বিচারক।
এদিকে, ২৩ বছর বয়সী ওই তরুণী ১২ পাতার 'ভিকটিম ইমপ্যাক্ট স্টেটমেন্ট' দিয়েছেন। এ বয়ানটি অতি অল্প সময়ের মধ্যে অনলাইনে অসংখ্য মানুষ পড়ে ফেলেছেন। এখানে দেখুন নির্যাতিতার স্টেটমেন্টটির সংক্ষিপ্ত অংশ। ধর্ষণের ঘটনা এবং এর পরের অবস্থা তিনি তুলে ধরেছেন এখানে।
'ইওর অনার,
যদি এটা নিয়মের মধ্যে পড়ে, তবে আমি স্টেটমেন্টের অধিকাংশটাই অভিযুক্তের উদ্দেশ্যে প্রদান করবো। আপনি আমাকে চেনেন না, কিন্তু আপনি আমার অভ্যন্তরে ছিলেন। এ কারণেই আমরা দুজন আজ এখানে এসেছি।

২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি, আমার বাড়িতে শনিবারের রাতটা বেশ চুপচাপ ছিল। বাবা ডিনার তৈরি করছিলেন। আর আমি আমার ছোট বোনকে নিয়ে টেবিলে বসেছিলাম। আমি সারাদিন কাজ করার পর বিছানায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। বাড়িতেই থাকবো ভাবলাম। কিন্তু ছোট বোনটি তার বন্ধুদের সঙ্গে একটা পার্টিতে চলে গেল। সেখানে আমার যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও যাইনি। কারণ ওখানে সবাই আমার চেয়ে বয়সে ছোট। কিন্তু বোনটা ছুটি কাটাতে একরাতের জন্যে এসেছে। ওই একটা রাতই তাকে কাছে পাই। কাজেই ওর সঙ্গে যাওয়ার চিন্তা করলাম। বাড়ি থেকে ১০ মিনিটের পথ। সেখানেই পার্টি। বড়দের ভাব নিতেই একটা কার্ডিগান পরলাম। ওটা দেখে বেশ মজা করলো বোন। আমি সেখানে গিয়ে পার্টিতে মজা করতে থাকলাম। মদ্যপ হলাম।
এর পর আর কিছুই মনে নেই। আমি দেখলাম হাতের শুকনো রক্ত আর ব্যান্ডেজ। মনে হয়েছিল আমি বুঝি পড়ে গেছি। ক্যাম্পাসের অ্যাডমিন অফিস থেকে পড়ে গেছি নাকি ভাবতে থাকলাম। ভাবছিলাম আমার বোনটা কোথায়? তব ধীর ও শান্ত ছিলাম। সেখানকার এক ডেপুটি বললেন, আমাকে নির্যাতন করা হয়েছে। এরপরও আমি ধীর ও শান্ত। মনে হচ্ছিল, ডেপুটি আমাকে ভুল ভেবে এসব বলছেন। স্পষ্ট মনে আছে, আমি হাত দিয়ে আমার দেহ স্পর্শ করে কিছুই অনুভব করছিলাম না। দেহের নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, আমার যৌনাঙ্গ ঢেকে রাখা পোশাকটি নেই। সেই অনুভূতির কথা আমি বলে বোঝাতে পারবো না।
এর পরপরই অনুভব করলাম যন্ত্রণা। মনে হচ্ছিল, কেউ আমার ঘাড়ের পেছন দিয়ে সুচ ঢুকিয়ে তা মাথা দিয়ে বের করে আনছে। তখন ভেতর থেকে কেউ যেন বলছিল, আমাকে একটু সাহায্য করো। পুলিশ অফিসার সেখানেই ছিলেন।
আমাকে এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে নেওয়া হচ্ছিল। বলা হচ্ছিল 'যৌন নির্যাতনের শিকার'। এসব শুনে মনে হচ্ছিল, কিছু একটা ঘটেছে। একটা রুমে একজন নার্স আমারে দেহের নানা অংশ পরীক্ষা করছিলেন। তখন আমি সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আরো তিনজন নার্স আমার মাথা থেকে পাইনের কাঁটাগুলো বের করছিলেন। পরীক্ষার জন্যে যৌনাঙ্গে বার বার নানা জিনিস প্রবেশ করানো হয়। ওষুধ খাওয়ানো হয়।
এভাবে কয়েক ঘণ্টা কাটানোর পর আমাকে গোসল করানো হয়। গোসল করতে করতেই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, এই দেহকে আমি আর চাই না। আমি জানি না, এতে আর কি কি হয়েছে? এটা অপবিত্র হয়ে গেছে। একে কে স্পর্শ করেছে? মনে হচ্ছিল, জ্যাকেটের মতো দেহটা খুলে হাসপাতালেই রেখে যাই।
পরদিন সকালে ঘটনা জানতে পারি। আমি নাকি একটা ডাম্পস্টারের পেছনে পড়েছিলাম। আমাকে এইচআইভি পরীক্ষার জন্যে যেতে হবে। কিন্তু মনে হচ্ছিল, বাড়িতে ফিরে যাই। স্বাভাবিক জীবন শুরু করি। হাসপাতালের সবাই আমাকে আন্তরিকভাবে বুকে জড়িয়ে নিলেন। তারা বিদায় জানালেন।
ছোট বোন চোখে পানি নিয়ে আমাকে নিতে আসলো। তার কষ্ট আমি নিতে চাইলাম। তার দিকে তাকিয়ে হাসি দিলাম। বললাম, আমি ঠিক আছি। সব ঠিক হয়ে যাবে। বললাম, চলো বাড়িতে যাই। কিছু খেতে হবে। আমার দেহে কাটা-ছেঁড়া ছিল। আমার যৌনাঙ্গে ব্যথা হচ্ছিল। আমার ভেতরটা পুরোপুরি ফাঁকা মনে হচ্ছিল।
আমার প্রেমিক জানে না আমার কি ঘটেছিল। ও শুধু বললো, আমি সেদিন রাতে সত্যিই ভয় পেয়েছিলাম। তুমি কি বাড়ি ফিরেছিলে ঠিকমতো? তখনই বুঝলাম, আমি ওকে ফোন দিয়েছিলাম ওই রাতে! পার্ট থেকে ফোন দিয়ে উল্টা-পাল্টা বলছিলাম। সে আমাকে বাড়িতে ফিরতে বলছিল। কি হয়েছিল? তুমি বাড়ি ফিরতে পেরেছিলে? আমি বললাম, হ্যাঁ। বলেই কাঁদতে শুরু করলাম।
মন থেকে সব ঝেড়ে ফেলতে চাইলাম। কিন্তু আমি খাই না, কথা বলি না, ঘুমাই না, কারো সঙ্গে মিশি না। ভয়ংকর এই পৃথিবীতে আতঙ্ক নিয়ে বেঁচে রয়েছি। ওই ঘটনার পর আমি কেবল দুঃস্বপ্নই দেখেছি।
একদিন, আমি কাজ করছিলাম। আমার ফোনে খবরটি দেখলাম। ওটা পড়েই জানতে পারলাম, আমার আসলে কি কি ঘটেছিল। অচেতন অবস্থায় কিভাবে আমাকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল, আমার চুল কিভাবে এলোমেলো হয়েছিল, আমার নেকলেস দিয়ে গলা পেঁচিয়ে ধরা হয়, আমার ব্রেসিয়ার খুলে ফেলা হয়, কাপড় টেনি ওপরে তোলা হয়, আমার দুই পা দুই দিকে ছড়িয়ে ছিল, আমার যৌনাঙ্গে কারো পুরুষাঙ্গ প্রবেশ করে। আমি বুঝলাম আমার কি কি হয়েছিল।
আমি ভাবতেও পারছিলাম না আমার জীবনের এমন একটা ঘটনা খবর হয়ে গেল। আমার পরিচিত ও পরিবারের মানুষরা তা পড়বেন।
খবরটি বেরোনোর পর আমি পরিবারের সবাইকে বললাম আমার কথা। কিন্তু আমি এখানে আছি, আমি ভালো আছি, আমি বেঁচে আছি।
ওই রাতের ঘটনার পর অপরাধী জানালেন, তিনি আমার নামও জানেন না। কয়েকজন মেয়ে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকলে তিনি আমাকে আলাদা করে চিনতেও পারবেন না। সেদিন আমাদের মধ্যে কোনো কথা হয়নি। দুজন নাকি নেচেছিলাম আর চুমু খেয়েছিলাম। কেবল নাচ আর চুমু থেকে ওই ঘটনা কিভাবে এতদূর গড়ায়? জবাবে সাঁতারু বলেছেন, তিনি জানেন না। তিনি আরো জানান, জোর করে এটা করার সময় তার নাকি মনে হয়েছিল আমি উপভোগ করছি। কারণ আমি নাকি কার পিঠ হাতড়ে দিচ্ছিলাম।
সেখানে আমি প্রায় নগ্ন অবস্থায় পড়েছিলাম। আমার নিম্নাঙ্গ উন্মুক্ত ছিল। আবার স্তনে ব্রা ছিল না। এ অবস্থায় যিনি আমাকে সেখানে পড়ে থাকতে দেখেছেন, তিনি কিভাবে বুঝবেন যে, এ ঘটনা আমি উপভোগ করিনি?
আমার মনে হয়, এখানে বিচারের কিছু নেই। এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আছে। আমার দেহে নোংরা লেগে রয়েছে। অপরাধী ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে যেতে পারেননি। কিন্তু তিনি ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি এ ঘটনায় আপসে আসতে চান। এরপর আমরা দুজনই দুজনের পথে চলে যাবো। আমাকে শক্তিশালী আইনজীবীর কাছে যেতে বলা হয়। এখানে গোয়েন্দা আসবেন। আমার একান্ত ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তারা ঘাঁটাঘাঁটি করবেন। এ ঘটনা আমি ভুলতে চাই। কিন্তু বিচারের মাধ্যমে বার বার আমাকে মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমাকে ব্যক্তিগত, অতীত জীবন নিয়ে একের পর এক অর্থহীন প্রশ্ন করা হচ্ছে। এ ঘটনার জন্যে আমি এত প্রশ্নের মুখোমুখি। অথচ ওই দিন ওই লোকটি আমাকে বিন্দুমাত্র জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন অনুভব করেননি যে আমি তার সঙ্গে যেতে চাই কি না?
ব্রক জানায়, সেদিন ডাম্পস্টানের পেছনে তিনি আমাকে কিভাবে নিয় গেছেন তা জানেন না। পরে নাচ আর চুমু প্রসঙ্গে তোলেন ছেলেমানুষি যুক্তি দাঁড় করাতে। তিনি জানিয়েছেন, পার্টিতে নাকি তিনি আমাকে সবকিছু অনুমতি নিয়েই করেছেন। বলা হচ্ছিল, অ্যালকোহল এর কারণ। এখানে আমার কাপড় ছিঁড়ে ফেলা, আঘাত করা বা ধর্ষণ অ্যালকোহল করেনি।'
এভাবে এগিয়ে গেছে তরুণির স্টেটমেন্ট। শেষে তিনি লিখেছেন,
'সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যে দুজন আমাকে বাঁচিয়ে এনেছেন তাদের ধন্যবাদ জানাই। তাদের সঙ্গে এখনো আমার দেখা হয়নি। এ গল্পে তারাই আমার হিরো।

সবার শেষে বলতে চাই, সব মেয়েদের সঙ্গেই আমি আছি। যে রাতে তোমরা একাকী বোধ করো, আমি আছি। যখন অন্যেরা তোমায় ত্যাগ করে, আমি আছি। আমি প্রতিদিন তোমাদের জন্যে লড়াই করবো। কাজেই তুমিও থেমে ‌থেকো না। প্রতিদিন প্রতি মিনিটে তোমরা শক্তিশালী হয়ে উঠছো। এ ক্ষমতা কেউ তোমাদের থেকে আলাদা করতে পারবে না। সব মেয়েদের সঙ্গেই আমি আছি। ধন্যবাদ।'

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.