ঈদযাত্রা শুরুর আগেই মহাদুর্ভোগ শুরু হয়েছে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে। এ মহাসড়ক দিয়ে চলাচলে গড়ে দ্বিগুণের বেশি সময় লাগছে। জয়দেবপুর-এলেঙ্গা চার লেন প্রকল্পের অধীনে উন্নয়নকাজের জন্য মহাসড়কের একটি অংশে যান চলাচল বন্ধ রাখা হচ্ছে। নির্মাণকাজের জন্য অর্ধেক অংশ বন্ধ রয়েছে ঢাকা-আশুলিয়া-চন্দ্রা মহাসড়কের গাজীপুরের চক্রবর্তী এলাকায়। মহাসড়কের অংশ বন্ধ রেখে গাজীপুরের সফিপুর থেকে স্কয়ার অংশে সংস্কারকাজ করতে হচ্ছে। উন্নয়ন ও সংস্কারকাজের ক্ষেত্রে আগে থেকে কোনো ঘোষণা না থাকায় যখন-তখন যানজট লাগছে। 

চার ঘণ্টার পথে লাগছে ১২ ঘণ্টা

তা ছাড়া যাত্রী তোলার জন্য এলোমেলোভাবে বাস থামানো, মহাসড়কের ওপর বাসস্ট্যান্ড, ফিটনেসহীন গাড়ি বিকল হয়ে পড়া, মহাসড়ক পুলিশের নির্লিপ্ততা, রাতে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে মহাসড়ক পুলিশ না থাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। গত রবিবার সকালে ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল ও টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় ফিরতে গিয়ে সরেজমিনে এই দুর্ভোগ দেখা গেছে। ভুক্তভোগী ক্ষুব্ধ যাত্রী ও চালকরা বলছেন, এই মহাসড়কে ‘চার ঘণ্টার রাস্তা এখন ১২ ঘণ্টা লাগছে’। অনেক ক্ষেত্রে যানজট না থাকলে ঢাকা-টাঙ্গাইল পথে আড়াই ঘণ্টায় গন্তব্যে পৌঁছা যায়। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক দিয়েই ঢাকা থেকে উত্তরের ১৬ জেলায় যাত্রীরা চলাচল করে। রমজান ঘিরে এ মহাসড়ক দিয়ে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনও বেড়ে গেছে। ঢাকা-জয়দেবপুর ও ঢাকা-আশুলিয়া-বাইপাইলসহ ঢাকা থেকে চারটি রুটই মিলেছে গাজীপুরের কালিয়াকৈরের চন্দ্রা মোড়ে। মহাসড়ক পুলিশের হিসাবে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দি, ঢাকা-জয়দেবপুর অংশের জয়দেবপুর মোড়ের চেয়েও বেশি চাপ পড়ছে চন্দ্রা মোড়ে।

প্রতিদিন গড়ে মিনিটে সাতটি গাড়ি অতিক্রম করছে চন্দ্রা মোড়। পাঁচ মিনিট গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকলেই ১০-১৫ কিলোমিটার যানজট লেগে যাচ্ছে। ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে গত রবিবার সকালে লোকাল বাসে রওনা দিয়ে পথে স্থানে স্থানে দেখা গেল যানজট। চন্দ্রা মোড়ে নেমেই চোখে পড়ল গাড়ির দীর্ঘ জট। ঢাকা-আশুলিয়া-বাইপাইল ও ঢাকা-জয়দেবপুর থেকে সারি সারি বাস গিয়ে সেখানে স্থির হয়ে আছে। চন্দ্রা মোড়ে মহাসড়কের পাশ ঘেঁষেই বাসস্ট্যান্ড, আশপাশে গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক বাস কাউন্টার। বনলতা এক্সপ্রেসের বাস কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে প্রত্যক্ষদর্শী জুলহাস হোসেন জানান, রাত ১২টা থেকে দুপুর ১১টা-১২টা পর্যন্ত যানজট লেগেই থাকে চন্দ্রায়। কখনো মির্জাপুরে, কখনো গোড়াইয়ে গাড়ি বন্ধ করে দেওয়া হয়। গাড়ির লাইন কখনো বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত ঠেকে। চার লেনের কাজের জন্য এ অবস্থা হয়েছে। চন্দ্রা মোড় থেকে টাঙ্গাইলমুখী পথে একটু দূরে গিয়েই দেখা গেল, বাঁ পাশে প্রায় ৬০০ মিটার অংশে মাটি ভরাট করা হচ্ছে। এক্সকেভেটর দিয়ে মাটি ফেলা হচ্ছে, রোলার দিয়ে সমান করা হচ্ছে। চার-পাঁচজন ব্যক্তি লাল পতাকা হাতে নিয়ে মাঝেমধ্যেই গাড়ি থামিয়ে দিচ্ছে। তাতেই যানজট লেগে যাচ্ছে। ট্রাকে মাটি নিয়ে এলে মহাসড়কের বাঁয়ের এ জায়গায় তা ফেলার জন্য মহাসড়কের ওই অংশে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে কখনো কখনো ২০-৩০ কিলোমিটারজুড়ে যানবাহনের দীর্ঘ সারির সৃষ্টি হয়। চন্দ্রা মোড়ে দেখা গেল, স্থানে স্থানে বিটুমিন দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু পুলিশ বক্সের চারপাশে নতুন বিটুমিনের আস্তরণ এমনকি পাথরকুচিও উঠে গেছে। পুলিশ বক্সের ভেতরে গিয়ে দেখা গেল, চেয়ারে বসে আছেন গাজীপুর সড়ক বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী বশির খান। চন্দ্রায় যানজট বেশি কেন—জানতে চাইলে বললেন, ‘চন্দ্রায় চাপ সবচেয়ে বেশি। তিন লাইন ধরে বাসগুলো যাত্রী তোলে ও নামায়। সফিপুর থেকে স্কয়ার পর্যন্ত মহাসড়কের অংশ সংস্কারকাজ চার দিন আগে শুরু হয়েছে। জনদুর্ভোগ হয় বলে আপাতত কাজ বন্ধ রাখছি। ঈদের আগে সংস্কারকাজ শেষ করা হবে। জলাবদ্ধতার জন্য চন্দ্রায় বিটুমিন ও পাথর ফেলে উঁচু করা হচ্ছে। সংস্কার করলেও অতিরিক্ত ওজনের মাল পরিবহনের জন্য মহাসড়কে আনডুলেশন (উচ-নিচু অবস্থা) তৈরি হচ্ছে।’ পাশেই উপস্থিত মহাসড়ক পুলিশের সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর সামসুল আলম বললেন, চার লেনের কাজের জন্য গাড়ির চাপ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। রাতে ও সকালে বেশি চাপ থাকে। তার ওপর পণ্যবাহী গাড়ি ইচ্ছামতো বেশি পণ্য পরিবহন করছে। প্রতিদিন মামলা হচ্ছে। তার পরও তা কমছে না।  

নবীনগর-গাজীপুর-শিমুলতলি রুটের পলাশ পরিবহনের রুট সুপারভাইজার এনামুল বললেন, এবার ঈদের আগেই জ্যাম দেখা যাচ্ছে। বাসের ট্রিপ কমে যাচ্ছে। যানজটের বড় কারণ হিসেবে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছে, জয়দেবপুর-চন্দ্রা-টাঙ্গাইল-এলেঙ্গা ৭০ কিলোমিটার মহাসড়ক দুই লেন থেকে চার লেনে উন্নীত করার কাজের জন্য যানজট হচ্ছে। ধীরগতির যানবাহন চলাচলের জন্য আলাদা সার্ভিস লেনসহ চার লেন প্রকল্পের কাজ চলছে সওজ অধিদপ্তরের অধীনে। চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এখন মাটি ভরাট ও পাইলিংয়ের কাজ করছে। চন্দ্রা থেকে ধলেশ্বরী পরিবহনের একটি বাসে উঠে টাঙ্গাইলের দিকে চলতে চলতে দেখা গেল, কোথাও চলছে মাটি ভরাটের কাজ, কোথাও চলছে সেতু, ফ্লাইওভার নির্মাণের প্রস্তুতি। বাসগুলো চলছিল খুব ধীরে। দুই লেনের মহাসড়কে বিভাজক না থাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়িগুলো গা ঘেঁষাঘেঁষি করে চলছিল। এক্সকেভেটর ও রোলার দিয়ে মাটির কাজ চলছিল চন্দ্রায়। খারাজোড়ায় মহাসড়কের মধ্যস্থলের বড় অংশ বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। বিকল্প ছিল পাশের সরুপথ। বাঁ পাশ দিয়ে চলছিল গাড়ির সারি। কালিয়াকৈর চক্ষু হাসপাতাল পার হয়ে আরো সামনে উত্তর হিজলতলায় সেতুর পাইলিংয়ের কাজ চলছিল। সূত্রাপুরে সেতু নির্মাণের প্রস্তুতি দেখা গেল। বাসচালকের সহকারী নান্নু মিয়া বললেন, যখন-তখন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। মাটি ফেলার জন্য ট্রাক মহাসড়কের ওপর আড়াআড়ি রাখায় এ অবস্থা হচ্ছে। দুই সপ্তাহ ধরে অবস্থা খারাপ।  চার লেন প্রকল্পের কাজ দৃশ্যমান দেখা গেল, গোড়াই, মির্জাপুর, সোহাগপুর বাজার অংশে। লতিফপুর ফ্লাইওভার নির্মাণের জন্য মহাসড়কের বাঁ পাশে নিচে পাইলিং শুরুর প্রস্তুতি চলছিল। 

সোহাগপুরে ৭২ মিটার দীর্ঘ সেতু করা হবে। মাটি ফেলা হচ্ছিল প্রকল্প এলাকায়। মির্জাপুরে ফায়ার সার্ভিস কার্যালয় পার হয়ে রেলপথ পার হয়েও চোখে পড়লো স্তূপ করে রাখা মাটি। ঢাকা থেকে ৭৬ কিলোমিটার দূরে পোষ্টকামুরীতে সেতু নির্মাণের জন্য মাটি কাটা হচ্ছিল। কদিমধল্লায় চলছিল মাটি ভরাটের কাজ। বাস ধীরে ধীরে চলছিল, তবে নাটিয়াপাড়া বাজারে গিয়েই থেমে গেল। বাস থেকে নেমে দেখা গেল, মাটিবাহী ট্রাক ঘোরানোর জন্য যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৪০ মিনিট সেখানে যানজটে আটকে থাকতে হলো। সেখানে আটকে পড়া সিয়াম-সিয়াব পরিবহনের চালক আবদুল জলিল বললেন, পাঁচ মিনিট আটকে থাকলেই লম্বা লাইন হয়ে যায়। চার ঘণ্টার রাস্তা ১২ ঘণ্টাও লাগে। করটিয়া পর্যন্ত যেতে যেতে দেখা গেল, ভূমি উন্নয়নের কাজ চলছে। প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের অধীনে ২৬টি সেতুর মধ্যে ২২টির কাজ শুরু হয়েছে। ৬০টি কালভার্টের ছয়টির ও একাধিক ফ্লাইওভারের কাজ শুরু হয়েছে। ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত চার লেনের কাজ চলবে। তবে চার লেন প্রকল্প পরিচালক দিলীপ কুমার গুহ জানান, মাটি ভরাটের জন্য মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ করা হচ্ছে না। তাঁর মতে, ট্রাক ঘোরানোর জন্য একটু সময় লাগছে। চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভূমি উন্নয়ন ও পাইলিংয়ের জন্য মাঠে কাজ করছে। 

টাঙ্গাইল থেকে ঢাকা : ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল পৌঁছাতে লেগেছিল ১০ ঘণ্টা। ফেরার সময় টাঙ্গাইল নতুন বাস টার্মিনালে গিয়ে যাত্রীদের কাছে জানা গেল, রাস্তায় থেমে থেমে যাত্রী তোলা হয় প্রায় সব বাসেই। টাঙ্গাইল থেকে সন্ধ্যা ৬টায় রওনা দিয়ে ধলেশ্বরী পরিবহনের বাসের টিকিট কেটে চন্দ্রায় আসতেই বেজে গেল রাত সাড়ে ৮টা। চন্দ্রা-টাঙ্গাইল রুটের নিয়মিত যাত্রী, ওয়াল্টন কম্পানির শ্রমিক হুমায়ুন কবীর চন্দ্রা মোড়ে নেমে যাওয়ার আগে জানালেন, এই পথ পাড়ি দিতে সাধারণত দেড় ঘণ্টা লাগে। আজ এক ঘণ্টা বেশি লেগেছে। গত ২ জুন চন্দ্রা থেকে টাঙ্গাইল যেতে তাঁর লেগেছিল আট ঘণ্টা। চন্দ্রা মোড়ে আধাঘণ্টা আটকে থেকে আশুলিয়া-বাইপাইল মহাসড়কে উঠতেই যাত্রীদের ত্রাহি অবস্থা। জিরানী এসেই দেখা গেল, বাস-ট্রাক-পিকআপ-সিএনজি অটোরিকশার জট লেগে গেছে। গাড়িচালকরা জানায়, চক্রবর্তী এলাকায় মহাসড়কের অর্ধেক বন্ধ রয়েছে। প্রায় এক ঘণ্টা পর সারি সারি গাড়ি চলতে শুরু করে। দমবন্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি পেলেও ধউর থেকে আব্দুল্লাহপুর অংশ পার হতেই আবার ২৫ মিনিট আটকে থাকতে হয় যানজটে। জয়দেবপুর, ময়মনসিংহ, উত্তরের বিভিন্ন জেলার যাত্রী ও পণ্যবাহী গাড়ির জট লেগে গেলেও রাতে আব্দুল্লাহপুরে মহাসড়ক পুলিশের দেখা মেলেনি। 

আব্দুল্লাহপুর থেকে সারি সারি গাড়ি চলতে শুরু করলেও উত্তরা থেকে বিমানবন্দর অংশ পার হতেই ৪০ মিনিট লেগে যায়। রাতে আবার জটের দেখা মেলে কাকলী-বনানীতে। আটকে থাকতে হয় ২১ মিনিট। বাইপাইল-আশুলিয়া-জিরানী-ধউর সড়কের স্থানে স্থানে দুরবস্থার জন্য বাসের গতি ছিল ধীর। মহাখালী বাস টার্মিনালে পৌঁছতে বেজে যায় রাত ১টা। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ঈদের পাঁচ দিন আগে চন্দ্রা, কোনাবাড়ী, এলেঙ্গা, আশুলিয়া, বাইপাইল, নবীনগর, কালিয়াকৈর, গোড়াইসহ বিভিন্ন পয়েন্টে যানজট নিরসনে ৯০০ স্বেচ্ছাসেবক নামানো হবে। চন্দ্রায় চাপ বেশি থাকায় ঢাকা থেকে বের হওয়ার তিনটি বিকল্প সড়ক কালিয়াকৈর-দিয়াবাড়ি-সাটুরিয়া, কালামপুর-ধামরাই-আরিচা-ঘিওর ও আরিচা-ঘিওর-নাগরপুর-টাঙ্গাইল সড়ক প্রস্তুত করা হচ্ছে। 

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.