বস্তুত নিউইয়র্ক শহরই দখল করেছেন বাংলাদেশিরানিউইয়র্ক আমার কাছে দ্বিতীয় ঢাকা। ১৯৯৫ সাল। আমার মেয়ে পদ্যর বয়স ৪০ দিন। জীবনে প্রথম পাসপোর্ট করেছি, সহধর্মিণী মেরিনার সঙ্গী হিসেবে বেঙ্গালুরু ভ্রমণ করে এসেছি, তারপরেই এসে গেল আমেরিকার দাওয়াত। ১২টি দেশের ১২ জন সাংবাদিককে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ফরেন জার্নালিস্টস তাদের দেশের গণমাধ্যমগুলো দেখাতে চায়। ১ হাজার ৪০০ জন আবেদন করলেন। ৩০০ শব্দের রচনা লিখতে হবে, ‘আমেরিকায় গিয়া আমি কী দেখিব।’ আমি লিখলাম, দেখিব—হয়ার দ্য মাইন্ড ইজ উইদাউট ফিয়ার। চিত্ত যেথা ভয়শূন্য উচ্চ যেথা শির। আমি দেখেছি, রবীন্দ্রনাথের এই কবিতাটা মহৌষধি, এটায় সারে না এমন কোনো রোগ নেই। ব্যস, আমি নির্বাচিত হয়ে গেলাম।

তখন ইউসিস ছিল মতিঝিল এলাকায়, পূর্বাণীর পাশে। গেলাম, পাসপোর্ট দিলাম, দুই দিন পরে ভিসাসহ নিয়ে এলাম। তারপর ৪০ দিন বয়সের কন্যাসন্তানকে রেখে আমি উঠে পড়লাম ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের বিমানে। সঙ্গে ২০০ মাত্র ডলার। এক প্যাকেট শুকনো সন্দেশ। প্রথম সপ্তাহ ছিলাম ওয়াশিংটন ডিসিতে। ওয়াশিংটন পোস্ট, ফ্রিডম ফোরাম, মহাকাশ জাদুঘর, ভয়েস অব আমেরিকা, নিউজিয়াম ইত্যাদি দেখে এক মাসের জন্য চললাম কলরাডো স্প্রিংসে। ছোট্ট পাহাড়ি শহর। একটা মোটেলে একা থাকি। শীতের দেশ। সেখানে রাস্তায় কেউ হাঁটে না, সবার গাড়ি আছে। আমি সন্ধ্যায় একা একা হেঁটে খাবার খুঁজতে যাই, ম্যাগডোনাল্ডস কেএফসির দোকানে যাই। বার্গারের গন্ধে বিবমিষা জাগে। একটু ভাত পাই কোথা? একটু বাংলায় কথা বলি কার সঙ্গে? ক্যাসেটে মেয়ের কান্না রেকর্ড করে এনেছি, রাতের বেলা তাই শুনি আর কাঁদি। প্রতি রাতে কেঁদেছি। চিঠি লিখেছি দেশে, ১৫ দিন পরে পৌঁছাবে। একদিন দেখি, একটা মেক্সিকান দোকানে ভাত দেখা যায়। খেতে গেলাম, রুটির মধ্যে পেঁচিয়ে দিল। না খাওয়াই ভালো ছিল। আরেক দিন আরেক দোকানে দেখি আলুভর্তা, আগ্রহসহকারে পাতে নিলাম! রুটি থেকে ভাত ছাড়িয়ে নিয়ে মাখলাম, ওয়াক থু। এ তো আলুভর্তা নয় (আসলে ছিল স্ম্যাশড পটেটো)।
এক মাস ভাত, বাংলা, বাঙালি বিহনে কাটিয়ে আমি নিউইয়র্কে এসে নামলাম। বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সির লাইনে দাঁড়িয়ে আমার কপালে যে ট্যাক্সি ড্রাইভার জুটল, তিনিই বাঙালি। ফাইভ স্টার হোটেলে উঠে খেতে নিচে নেমে দোকানে ঢুকে যাঁকে পয়সা দিতে যাব, তিনি বললেন, বাংলায়, টাকা দিতে হবে না, আপনি যান। রাত দুইটার দিকে হোটেলের ফোন বেজে উঠল, আমি ‘হ্যালো’ বলতেই নিচ থেকে সাংবাদিক মিনার মাহমুদের গলা, ‘এই আনিস, নিচে নামেন, আমার ট্যাক্সিতে রাতের নিউইয়র্ক দেখাব।’
টিউব রেলে চড়ে সাংবাদিক মঞ্জুরুল ইসলামের বাড়ি যাওয়ার জন্য বেরিয়ে একটা পাড়ায় একজনকে ইংরেজিতে শুধালাম, এই ঠিকানাটা কোন দিকে হবে, তিনি পরিষ্কার বাংলায় বললেন, ওই যে, ওই বাড়ি যান। হাত দিয়ে মেখে আলুভর্তা, ডাল, ঝোলওয়ালা মাংস কিংবা ইলিশ মাছ ভক্ষণ—এক মাসের অর্ধাহারের পর, যে শহর আপনাকে তা দেয়, আপনি সেই শহরের প্রেমে না পড়ে পারবেন? সেবারই জাতিসংঘের সদর দপ্তরে হাসান ফেরদৌস ভাইয়ের অফিসে গেছি। কথাসাহিত্যিক জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের সঙ্গে দেখা করে আপেল পাই খেয়েছি। আর গেছি জ্যাকসন হাইটসে। আলাউদ্দিনের মিষ্টির দোকান, মুক্তধারা, বাংলা বই আর ক্যাসেটের দোকান। হোটেল-রেস্তোরাঁয় বাংলাদেশের বাঙালিরা গিজগিজ করছেন। আজ থেকে ২১ বছর আগের কথা বলছি।
এরপরে আরও কয়েকবার নিউইয়র্ক যাওয়া হয়েছে আমেরিকানদের দাওয়াতেই। কিন্তু বাঙালিদের আমন্ত্রণে যাওয়া হলো ২০০৬ সালে। মুক্তধারার বইমেলায়। এ বইমেলা ১৯৯২ সাল থেকে হচ্ছে। জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, শহীদ কাদরী, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, হুমায়ূন আহমেদ, শীর্ষেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, জয় গোস্বামী, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী প্রমুখ এই মেলা উদ্বোধন করেছেন। এঁদের প্রত্যেকের লেখার আমি ভক্ত। শহীদ কাদরী, সুনীল, জয়ের কবিতা আমি মুখস্থ বলে দিতে পারব। আমি দূর হতে তোমাকে দেখেছি, আর মুগ্ধ এ চোখে চেয়ে থেকেছি। ২০০৬ সালের মধ্যে আমার লেখা মা বেরিয়ে গেছে (২০০৩), ৫১বর্তী নাটক দেশে ও দেশের বাইরে বেশ চলছে, তখন ৫১ বর্তীর শিশুশিল্পী আমার ভাগনে কাব্যকে নিয়ে কুয়ালালামপুরের রাস্তায় হাঁটতে গেলেও বাঙালিদের সঙ্গে হাত মেলাতে হয়। কাজেই মুক্তধারা নিউইয়র্কের উদ্যোক্তারা আমাকে বাছাই করলেন। আমি তো ‘আরেকবার সাধিলেই খাইব’ ভাব নিয়ে ‘না না, এবার হবে না’, ‘পরের বার’ বলে স্যুটকেস গোছাতে শুরু করলাম।
এরপরের বছর আবার গেলাম। সেবার সঙ্গী হলাম ড. আনিসুজ্জামান স্যার, রাবেয়া খাতুন, শিল্পী মাহমুদুজ্জামান বাবু, হাবিব, শ্রীকান্ত, কবি তারিক সুজাত আর কুদ্দুস বয়াতির। শুধু কুদ্দুস বয়াতি যে গল্পটা বলে এখন বিভিন্ন আসরে মজা করে বেড়ান, সেটা বলি। মুক্তধারা আমাদের যে দাওয়াতপত্রটা দিয়েছে, সেটা সবাই আমরা হ্যান্ড লাগেজে নিয়েছি। ইমিগ্রেশনে চাওয়ামাত্র আমরা তা দেখাব। তারপর ভবনদী পার হয়ে যাব। কুদ্দুস বয়াতি তাঁর কাগজ রেখেছেন চেকড ইন লাগেজে। বিমানে মাহমুদুজ্জামান বাবু বললেন, ও কুদ্দুস, কী করবা।
বুদ্ধি দেন, কী করমু।
কইবা, নো ইংলিশ।
আমরা ইমিগ্রেশন পার হয়ে গেলাম।
কুদ্দুস বয়াতিকে জিজ্ঞেস করে, কেন এসেছ?
নো ইংলিশ।
কত দিন থাকবা?
নো ইংলিশ।
তাঁকে ধরে পাশের একটা ঘরে নিয়ে যাচ্ছে, যেমন যায়, কুদ্দুস বয়াতি আমাদের দেখিয়ে হাত নাড়তে নাড়তে সেই জেরা কক্ষে ঢুকলেন।
আধঘণ্টা পরে চলে এলেন।
বাবু ভাই বলেন, কী হলো কুদ্দুস? কী বললা।
কুদ্দুস ভাই হেসে বললেন, নো ইংলিশ।
পাসপোর্টে তাঁর পেশার ঘরে ‘শিল্পী’ লেখাই ছিল, পরনে আলখেল্লা, তাঁকে কি আর আটকে রাখতে পারে? শিল্পীদের কি আটকে রাখা যায়?
২৫ বছর ধরে নিউইয়র্কে বইমেলা হয়, বাংলা ভাষার উৎসব হয়। এবার উদ্বোধন করতে এরই মধ্যে পৌঁছে গেছেন সেলিনা হোসেন। নিউইয়র্কে পা রেখেছেন রামেন্দু মজুমদার, মোহিত কামাল, আমীরুল ইসলাম। প্রকাশক ফরিদ আহমেদ, মনিরুল হক প্রমুখ। কলকাতা থেকে আসছেন রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়সহ অনেকেই। সংগীতশিল্পীরা আসবেন। ইউরোপ থেকে, কানাডা থেকে বাঙালি লেখকেরা আসবেন। অনেকগুলো বইয়ের মোড়ক উন্মোচিত হবে। এর মধ্যে আমার লেখা মা উপন্যাসের স্প্যানিশ অনুবাদের মোড়ক উন্মোচন করা হবে। আমাকে ডাকতে হয় না, আমি নিজে নিজে গিয়েই হাজির হই।
একবার নিউইয়র্কে কবি নির্মলেন্দু গুণ একটা মেলা উদ্বোধন করছেন, আমি দৌড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম তাঁর পাশে। সেবার লাভ হয়েছিল নির্মলেন্দু গুণের নিজের মুখে ‘হুলিয়া’ কবিতাটার আবৃত্তি শোনা। সে এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা। একবার, ২০০৭ সালে হবে, কবি তারিক সুজাত ছিলেন, আমরা কয়েকজন কবি, একটা হলঘরে, অনেকগুলো কবিতা নিজেরা পড়েছি। সেই সন্ধ্যাটা আমি কোনো দিন ভুলব না। যেমন ২০০৬ সালে শহীদ কাদরীকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে, তিনি সামনের সারিতে বসে আছেন, আমি তঁার পায়ের কাছে গিয়ে বসলাম, জিগ্যেস করলাম তাঁর কুশল। আরেকবার কুইন্স লাইব্রেরিতে পাঠকদের মুখোমুখি একটা অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলাম, ওই লাইব্রেরিতে প্রচুর বাংলা বই ও বাঙালি পাঠক আছে, সেখানে উপস্থিত ছিলেন গোলাম মুরশিদ স্বয়ং। এটার আয়োজন করেছিল মূলধারার লাইব্রেরিই বা এর ম্যানেজার আবদুল্লাহ জাহিদ ভাই।
এবারের নিউইয়র্ক মুক্তধারার বইমেলা ও বাংলা উৎসব অনুষ্ঠিত হবে ২০ থেকে ২২ মে, শুক্র থেকে রোববার, PS 69, 37th Ave & 77th St. Jackson Heights, NY 11372. বইমেলার আহ্বায়ক হাসান ফেরদৌস। আগে অনুষ্ঠান শুরু হতে দেরি হতো, এখন নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ব্যাকস্টেজ সামলায়, এক মিনিট দেরি হলে ঝাড়ি খেতে হয়, আনিস কাকু, তুমি তিন মিনিট লেট। বিশ্বজিৎ সাহারা এই একটা কাজ করতে পেরেছেন, দ্বিতীয় জেনারেশনের বাংলাদেশি আমেরিকানদের এই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চার কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে নিতে পেরেছেন।
আরেকটা গল্প বলে শেষ করব। বছর দু-এক আগে নিউইয়র্কে গেছি। আমাদের বন্ধু সাংবাদিক মঞ্জুরুল ইসলামের গাড়িতে আমি সামনের সিটে তাঁর পাশে বসে আছি। আমরা একটু আগে ম্যানহাটনের নদীর ধারে ভুল জায়গায় গাড়ি পার্ক করে ১২৫ ডলার জরিমানা খেয়েছি। এরপর মঞ্জু গাড়ি চালিয়ে আরেকটা জায়গায় নিয়ে গেল। পার্কিং খুঁজছি। এই সময় একজন ট্রাফিক পুলিশ সার্জেন্ট আমার কাচের জানালায় নক করতে লাগলেন। আবার কী ভুল হলো, এবার কত ডলার জরিমানা হবে ভেবে আমি কাচ নামালাম। পরিষ্কার বাংলায় নারী পুলিশ কর্তা বললেন, ‘আনিস ভাই, কবে এসেছেন।’
নিউইয়র্ক শহরে ট্রাফিক পুলিশের হাজার হাজার পদ দখল করেছেন বাংলাদেশি নারীরা। বস্তুত নিউইয়র্ক শহরই দখল করেছেন বাংলাদেশিরা। ২ সেপ্টেম্বর ২০১৫ কলকাতার দেশ পত্রিকায় সুমিত মিত্র লিখেছেন, ‘পৃথিবীর সব প্রান্তে, বিশেষ করে উন্নত দেশসমূহে, “বাঙালি” পরিচয়টির অর্থ বাংলাদেশের মানুষ।’ নিউইয়র্কও এর ব্যতিক্রম নয়।
কাজেই নিউইয়র্কের প্রতি আমার প্রেম কোনো অব্যাখ্যাত ব্যাপার নয়। নিউইয়র্কে সব পাবেন—রুচির চানাচুর, প্রাণের হলুদ, ইলিশ মাছ, শুঁটকি, এঁচড়, কচুর লতি, আলাউদ্দিনের মিষ্টি, বাংলাদেশি চ্যানেল এবং বাংলাদেশি রাজনীতি। কিন্তু সব বাংলাদেশির হৃদয়ে পাবেন এক অভিন্ন রং—লাল-সবুজ, সবার হৃদয়েই আসলে বাংলাদেশ।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.