সরকার অবশেষে জ্বালানি তেলের দাম কমিয়েছে। অকটেন ও পেট্রলের দাম লিটারে ১০ টাকা কমালেও সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে তিন টাকা কমানো হয়েছে।

 

ডিজেল-চালিত যানবাহনে যাত্রীভাড়া বা সেচের পানির দাম কমার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তাই দাম কমার কারণে বছরে যে আর্থিক সাশ্রয় হবে, তার পুরোটাই পাবেন পরিবহন বা সেচপাম্পের মালিকেরা।
জ্বালানি তেলের মধ্যে ডিজেল, ফার্নেস ও কেরোসিনের দামের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সাধারণ মানুষের স্বার্থ জড়িত। ডিজেল ব্যবহৃত হয় বাস-ট্রাক, লঞ্চ-স্টিমার, ট্রেন এবং কৃষিতে সেচের কাজে। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম তিন টাকা কমানো হলেও সেচ ও যানবাহনের ব্যয় কিছু কমবে। কিন্তু তার পরিমাণ এতই কম হবে যে যানবাহনের ভাড়া কমবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
ধরা যাক ঢাকার গণপরিবহনের কথা। মিরপুর ১২ থেকে গুলিস্তান বা মতিঝিলের দূরত্ব সর্বোচ্চ ১৫ কিলোমিটার। ডিজেলের দাম যেটুকু কমানো হয়েছে, তাতে প্রতি কিলোমিটারে তিন পয়সা ভাড়া কমতে পারে। সে হিসাবে ১৫ কিলোমিটারে ভাড়া কমার কথা ৪৫ পয়সা। পরিবহনমালিক ও শ্রমিকেরা এই হিসাবই যাত্রীদের দেখাবেন। আর যেহেতু খুচরা পয়সার প্রচলন প্রায় উঠেই গেছে (এক টাকার প্রচলনও তেমন নেই), সেহেতু ভাড়া কমানোর কোনো সুযোগ থাকবে না। যাত্রীরাও ক্রমে মেনে নেবেন। মাত্র ৪৫ পয়সার তো ব্যাপার।
ঢাকা থেকে যে জেলা বা উপজেলা শহরের দূরত্ব ৩০০ কিলোমিটার, সেখানেও ডিজেলচালিত বাসে ভাড়া কমবে ৯ টাকা। বিদ্যমান ভাড়া ৫০০ টাকা হলে সেখান থেকে ৯ টাকা কম নেওয়া বা দেওয়ার ব্যাপারে পরিবহনমালিক বা যাত্রী—কেউই তেমন আগ্রহী হবেন না। ফলে সরকারকে ভাড়া কমানোর কোনো উদ্যোগ নিতে হবে না। এতে পরিবহনমালিকের মুনাফা বাড়বে।
ট্রাকে মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ডিজেলের দাম কমানোর কোনো প্রভাব পরিবহন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও পড়বে না। অথচ ট্রাকমালিকের মুনাফা ঠিকই বাড়বে। লঞ্চ-স্টিমারের ভাড়াও এবারের তেলের দাম কমানোর কারণে কমবে—এমন বিশ্বাস করার কারণ নেই।
এ বিষয়ে আলাপকালে একজন পরিবহনমালিক বলেন, ‘বেসরকারি খাতের বাস-ট্রাক-লঞ্চের কথায় পরে আসেন। আগে বলেন, সরকারি খাতের স্টিমার কিংবা ট্রেনের ভাড়া কমবে?’ তিনিই জবাব দেন, ‘কমবে না। আপনি লিখে রাখেন, কমবে না। তাঁরা কমালে আমরাও কমাতে পারব।’
পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেনগুলো চালাতে প্রতিদিন ৬০ হাজার লিটার ডিজেল লাগে। প্রতি লিটারে তিন টাকা কমলেও প্রতিদিন এই খাতে সাশ্রয় হবে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। সে হিসাবে মাসে সাশ্রয় হবে ৫৪ লাখ, বছরে ৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। মাত্র কিছুদিন আগে রেলের ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই সাশ্রয়ের কারণে সে সিদ্ধান্তে কি কোনো পরিবর্তন আসবে? রেলপথ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা এর জবাবে সরাসরি কিছু না বললেও সম্ভাবনা যে ক্ষীণ, তা বুঝিয়ে দিয়েছেন।
তাহলে কী হলো! ডিজেলচালিত বাস-ট্রাক, লঞ্চ-স্টিমার, ট্রেন—কোনোটারই ভাড়া কমবে না। তাহলে সাধারণ মানুষের লাভ হলো কী। অথচ প্রতি লিটার ডিজেলের দাম যদি ১০ টাকা কমানো হতো, তাহলে অবশ্যই ভাড়া কমাতে হতো। কিন্তু সরকার দাম কমানোর অনেক আগে থেকেই বলে আসছিল, ডিজেলের দাম কমালে মালিকেরা ভাড়া কমাতে চান না। ডিজেলের দাম লিটারে তিন টাকা কমিয়ে ভাড়া না কমানোর সুযোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ডিজেলের দাম বেশি কমিয়ে যানবাহনের ভাড়া কমানোর জন্য মালিকদের সঙ্গে দর-কষাকষি করার ঝুঁকি সরকার নেয়নি। ফলে সাধারণ মানুষের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছে।
আর্থিক বিবেচনায় ডিজেলের দাম যে প্রতি লিটারে ১০ টাকা কমানো যেত না, তা নয়। কারণ, তিন টাকা কমানোর পরও প্রতি লিটার ডিজেলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথা সরকারের মুনাফা হবে প্রায় ২৫ টাকা। বিদ্যমান বাজারদরে প্রতি লিটার ডিজেল কিনতে বিপিসির দাম পড়ছে ৪০ টাকার কম। বিক্রির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৫ টাকা। অবশ্য সরকার কর নেয় লিটারে প্রায় ১০ টাকা।
ডিজেলের দাম কমানোর সুবিধা সাধারণ কৃষকও পাবেন না। কারণ, সেচের জন্য সাধারণ কৃষক ডিজেল কেনেন না। তাঁরা কেনেন সেচপাম্পের মালিকের কাছ থেকে পানি। পানির দাম নির্ধারণ করে দেন ওই মালিক। তবে লিটারে ১০ টাকা কমানো হলে পাম্প মালিক পানির দাম কিছুটা হলেও কমাতেন বা কমাতে বাধ্য হতেন। এখন তিন টাকার জন্য আর কীই-বা কমাবেন—এমন একটা ভাব দেখিয়েই চালিয়ে দেবেন প্রায় ক্ষেত্রেই। তবে তাঁর মুনাফা ঠিকই বাড়বে। সরকারি হিসাবে এ বছর সেচে ডিজেল ব্যবহৃত হবে নয় লাখ টনেরও বেশি। প্রতি লিটার ৩ টাকা কমায় এই ৯ লাখ টন ডিজেলের জন্য সেচপাম্প মালিকদের কিন্তু সাশ্রয় হবে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
ফার্নেস তেল ব্যবহৃত হচ্ছে মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদনে। এই তেলের দাম কম থাকলে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয়ও কম পড়ে। ফলে সেই সুবিধা বর্তমানে পায় দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ। সরকার ফার্নেসের দাম প্রতি লিটারে ১৮ টাকা কমিয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর দাম আরও কমানো যেত। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ফার্নেসের দাম আন্তর্জাতিক বাজারদরের সমান করা উচিত, যা বর্তমানে প্রতি লিটার ৩০ টাকারও কম।
সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য আরেকটি জ্বালানি পণ্য কেরোসিন। সরকারি হিসাবে দেশের প্রায় ২৭ শতাংশ মানুষ এখনো বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। এরা সবাই কেরোসিন ব্যবহার করে। তাই কেরোসিনের দাম আরেকটু কমিয়ে তাদের কিছুটা বাড়তি স্বস্তি দেওয়া যেত। তাতে সরকার তথা বিপিসির মোটেই লোকসান হতো না। মুনাফা কিছুটা কমত মাত্র।
তবে সরকার সাধারণ মানুষের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বিত্তবানদের একটু বেশি সুবিধাই দিয়েছে। মূলত ব্যক্তিগত গাড়িতে ব্যবহার্য অকটেন ও পেট্রলের দাম কমিয়েছে লিটারপ্রতি ১০ টাকা। অকটেন ব্যবহারকারীদের সাশ্রয় হবে বছরে ১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। আর পেট্রল ব্যবহারকারীদের সাশ্রয় হবে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ অকটেন ও পেট্রলের দাম কমানোয় বিপিসির ওই পরিমাণ টাকা বছরে মুনাফা কমবে। এই হিসাব বিপিসির সূত্রে পাওয়া।
একইভাবে দাম কমানোয় ডিজেল বিক্রি করে বিপিসির মুনাফা কমবে বছরে ৯৯০ কোটি, কেরোসিনে ৮২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ডিজেল ও কেরোসিন ব্যবহারকারীদের ওই পরিমাণ সাশ্রয় হবে। তবে এই সাশ্রয়ের সুবিধা পরোক্ষ ব্যবহারকারীরা পাবেন না।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমছে ২০১৪ সালের জুন থেকে। এই সুযোগে বিপিসি মোট প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। একপর্যায়ে দেশে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর জন্য প্রায় সব মহল থেকে দাবি ওঠে। সেই প্রেক্ষাপটে সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ‘যৌক্তিক’ করার উদ্যোগ নেয় এবং এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ফার্নেস তেলের দাম প্রতি লিটার ১৮ টাকা কমিয়ে ৪২ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরপর প্রক্রিয়া শুরু করা হয় অন্যান্য জ্বালানি তেলের দাম কমানোর। গত ২৪ এপ্রিল রাত ১২টার পর থেকে অকটেন, পেট্রল, ডিজেল ও কেরোসিনের দাম কমানো হয়।
দেশে সর্বশেষ ২০১৩ সালের ৪ জানুয়ারি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ১২০ মার্কিন ডলার। দেশে তখন দাম বাড়িয়ে প্রতি লিটার অকটেন ৯৯ টাকা, পেট্রল ৯৬, ডিজেল ও কেরোসিন ৬৮ এবং ফার্নেস তেল ৬০ টাকা করা হয়।

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.