রাজধানীতে বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে। অনেক এলাকার বাসিন্দা ওয়াসা থেকে সরবরাহ করা পানি নিয়মিত পাচ্ছেন না। আর যে পানি পাওয়া যাচ্ছে তাও পানের সম্পূর্ণ অযোগ্য। ফুটিয়ে এবং দামি ফিল্টার ব্যবহার করেও দুর্গন্ধ থেকে মুক্তি মিলছে না। অনেক এলাকায় হলুদ রঙের পানি বের হচ্ছে। ফুটালে পানিতে ফেনা তৈরি হচ্ছে। 

রাজধানীতে বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার

এ জন্য বিশুদ্ধ পানির জন্য নগরবাসীকে বাজার থেকে বোতলজাত পানি কিনে খেতে হচ্ছে। আর যারা বোতলজাত পানি কিনতে পারছেন না তারা ওয়াসার পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে কাঠফাটা রোদে পুড়ে পানি সংগ্রহ করছেন।

কয়েক দিন ধরে সারা দেশে তীব্র তাপপ্রবাহ চলছে। রাজধানীতেও বিরাজ করছে অসহনীয় তাপমাত্রা। দিনের বেলা বাইরে বেরোলেই ঘেমে নেয়ে একাকার হচ্ছে মানুষ। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। নগরীর বিভিন্ন স্থানে অনেক মানুষ গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। হাসপাতালগুলোতেও রোগী ভর্তির সংখ্যা বেড়েছে। গরমে বেড়েছে পানির চাহিদা; কিন্তু সে অনুযায়ী বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছে না মানুষ। রাস্তার ধারে-দোকানে ফিল্টারের নামে অপরিচ্ছন্ন পানি বিক্রি হচ্ছে।

 বিশুদ্ধ পানির দাবিতে গত রোববার মগবাজার এলাকার মানুষ কলস, বালতি নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। ওই এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, ওয়াসা থেকে বাসায় যে পানি দেয়া হয় তা খাওয়া যায় না। তবে ওয়াসার পাম্পেই গভীর নলকূপের পানি পাওয়া যায়। এতদিন পাম্প থেকে পানি সংগ্রহ করা গেলেও এখন তা-ও ঠিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। তা ছাড়া এখন গরম বেড়ে যাওয়ায় পানির দুর্গন্ধ আরো বেড়ে গেছে। ফলে আগে যারা বাসার পানি ফুটিয়ে অথবা ফিল্টারে ছেঁকে পান করতেন এখন তারাও লাইনে দাঁড়িয়ে ওয়াসার পাম্প থেকে পানি সংগ্রহ করছেন।

ফার্মগেটের গ্রিনরোড, মোস্তফা রোড আবাসিক এলাকা, তেজতুরি বাজারসহ ওই এলাকায় দীর্ঘ দিন ধরেই বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট চলছে। এলাকার বাসিন্দা খোকন বড়–য়া বলেন, ওয়াসার পানি খাওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। পানির রঙ হলুদ হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে ময়লা আসে। কেঁচোর বাচ্চাও পাওয়া যায়। পানি ফুটালেও গন্ধ যায় না। ফেনা তৈরি হয়। এ কারণে অনেকে এলাকার মসজিদ থেকে পানি সংগ্রহ করেন। বাজার থেকে বোতলজাত পানি কিনে খেতে হচ্ছে; কিন্তু কতদিন কিনে খাওয়া সম্ভব।

মিরহাজিরবাগ ঘুণ্টিঘর এলাকায় ভাড়া বাসায় সপরিবারে থাকেন ধোলাইখালের একটি ওয়ার্কশপের মেকানিক কবির হোসেন। কাজের তাগিদে তাকে বের হতে হয় সকাল ১০টার আগেই; কিন্তু পানির সঙ্কটে প্রায়ই ঝামেলা পোহাতে হয় কবিরের পরিবারকে। তিনি বলেন, সকাল ৮টার পরপরই লাইনে পানি পাওয়া যায় না। পানি আসে সন্ধ্যা ৬টা অথবা রাত ৮টার পর। তিনি জানান, রিজার্ভ ট্যাংক তুলনামূলক ছোট হওয়ায় অবস্থা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

কবিরের মতো একই অভিযোগ শেখপাড়া এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর রহমানের। তিনি জানান, পানি সঙ্কটে রান্নাবান্নার কাজসহ প্রয়োজনীয় কাজে পানি পাওয়া কষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাইনে পানি না থাকায় এ কষ্ট প্রতিনিয়ত পোহাতে হয় এলাকাবাসীর। রিজার্ভ ট্যাংকির মাধ্যমে গৃহস্থালির কাজ চালালেও একসময় তা ফুরিয়ে গেলে পানির জন্য রাত পর্যন্ত অপো করতে হয়। দিনে চাহিদা মতো পানি না পাওয়ায় দুর্ভোগে পড়ছে মানুষ।

রাজধানীতে বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার


বাসাবো কদমতলা এলাকার ওয়াসার পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষের দীর্ঘ লাইন। আরিফ হোসেন নামে একজন বলেন, সকাল ৭টায় এসেই দেখি লাইনে অনেক মানুষ। শেষ পর্যন্ত তিনি সকাল ১০টার দিকে পানি সংগ্রহে সক্ষম হন। তিনি জানান, আগে পাম্পে দুইটি কল থাকলেও একটি বন্ধ করে দিয়েছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। শহিদুল ইসলাম নামে একজন বলেন, কদমতলা এলাকায় ওয়াসার পানিতে দীর্ঘ দিন থেকেই দুর্গন্ধ। গরম বেড়ে যাওয়ায় গন্ধের মাত্রা বেড়ে গেছে। এ পানি ফুটালে ফেনা তৈরি হয়। প্রায় তিন হাজার টাকা দিয়ে একটি নামি কোম্পানির ফিল্টার কিনেছি। তাতে দিলেও গন্ধ যাচ্ছে না। গ্রাম থেকে আত্মীয়স্বজন এলে এ পানি খেতে পারে না। তাদের বোতলজাত পানি কিনে খাওয়াতে হয়।

পানি সঙ্কটের বিষয়টি স্বীকার করে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসীম এ খান নয়া দিগন্তকে বলেন, শুষ্ক মওসুমে রাজধানীতে পানির স্তর কিছুটা নেমে যায়। এ ছাড়া তীব্র তাপদাহ চলায় পানির চাহিদা বেড়ে গেছে। কিছু পাম্পে কারিগরি ত্রুটিও দেখা দিয়েছে। এ কারণে পানি সরবরাহে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। এ জন্য তিনি নগরবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। তবে এ সমস্যা সাময়িক মন্তব্য করে তিনি বলেন, ঢাকার সব জায়গায় সমস্যা হচ্ছে না, কিছু কিছু এলাকায় সমস্যা হচ্ছে যা সমাধানে ওয়াসা সব সময় তৎপর রয়েছে। তিনি পানি ব্যবহারে নগরবাসীকে আরো মিতব্যয়ী হওয়ার আহ্বান জানান।

ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, সরবরাহ লাইন অনেক স্থানে পুরনো ও ত্রুটিপূর্ণ থাকায় সরবরাহকৃত পানিতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দূষণ ঘটছে। বর্তমানে এসব লাইনের সংস্কার ও আধুনিকায়নের কাজ চলছে। পুরনো ত্রুটিপূর্ণ পানির লাইন সরিয়ে নতুন চওড়া পাইপ বসানো হচ্ছে। এ কারণেও অনেক এলাকায় পানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। এতে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে পানির সঙ্কট বেড়ে গেছে।

ওয়াসার জরিপ অনুযায়ী, দৈনিক উত্তোলিত ২৩০ কোটি লিটার পানির মধ্যে প্রায় ৫৭ কোটি লিটার অর্থাৎ ২৫ শতাংশই অপচয় হয়। পুরান ঢাকায় পানির অপচয় হয় চোখের সামনে; কিন্তু অভিজাত এলাকায় অপচয় হয় আড়ালে এবং তা পরিমাণেও পুরান ঢাকার চেয়ে অনেক বেশি। কোনো কোনো বাড়িতে বৈধ সংযোগের পাশাপাশি অবৈধ সংযোগও আছে। অবৈধ সংযোগের পানি দিয়ে গাড়ি ধোয়া, বাগানে পানি দেয়া, কুকুরকে গোসল করানোসহ বিভিন্ন কাজ করা হয়। অবৈধ সংযোগের পানি হওয়ায় এর সবই অপচয়ের খাতে পড়ে।

ওই জরিপ অনুসারে, রাজধানীর অনেক বাড়ির মালিক সময় বেঁধে পানি দেন। ফলে পানি ছাড়লেই এসব বাড়ির ভাড়াটেরা বড় ড্রাম, বালতি, গামলাসহ বিভিন্ন পাত্রে পানি ভরে রাখেন। পরের বার পানি দেয়ার সময় এসব পাত্রের উদ্বৃত্ত পানি ভাড়াটেরা ফেলে দিয়ে নতুন পানি ভরেন। এতে অনেক পানির অপচয় হয়। এ ছাড়া কেউ কেউ পানির আশায় বা ভুলে কল খোলা রেখেও পানির অপচয় করেন।

ওয়াটার এইড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় প্রতি বছর পানির স্তর নামছে তিন মিটার হারে। অন্য দিকে, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত এক দশকে রাজধানী ঢাকায় আড়াই মিটার হারে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অবস্থা যদি আরো কয়েক দশক চলতে থাকে তবে দেখা দেবে পানির ভয়াবহ সঙ্কট। সেই সাথে ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

Post a Comment

বাংলাদেশ

[National][fbig1]

ঢাকা উত্তর

[Dhaka North][slider2]

ঢাকা দক্ষিন

[Dhaka South][slider2]

আন্তর্জাতিক

[International_News][gallery2]

ঢাকা উপজেলা

[Dhaka Upazila][fbig2 animated]

রাজনীতি

[political_news][carousel2]

অপরাধ

[Crime][slider2]
Powered by Blogger.